দক্ষিণ এশিয়ার জেন জি বিপ্লবগুলো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি

চ্যাথাম হাউজ বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক : বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নতুন সরকারগুলোর পরিবর্তনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে। কিন্তু শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জিং প্রমাণিত হচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যুব-নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ আন্দোলনের ফলে ক্ষমতায় আসা অপেক্ষাকৃত নতুন সরকারগুলো জনগণের ম্যান্ডেট ধরে রেখেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং ভারতের সাথে জটিল সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জগুলোর সাথে এখন তাদের লড়াই করতে হচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের (রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) এক বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্দোলননির্ভর শাসনব্যবস্থার ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।

সাদৃশ্য ও পার্থক্য

২০২২ সালে, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের সরকার ‘আরাগালায়া’ (‘সংগ্রাম’) নামে পরিচিত একটি গণবিক্ষোভ আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ‘বর্ষা বিপ্লব’ সংঘটিত হয়, যেখানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালে নেপালে তথাকথিত ‘জেন জি বিপ্লব’ প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

এই আন্দোলনগুলোর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক সঙ্কট (তিনটি দেশই আইএমএফের বেলআউটের অধীনে ছিল), জনসংখ্যাগত চাপ এবং রাজনৈতিক অকার্যকারিতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী প্রবণতার কারণে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। সামাজিক মাধ্যমও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং সরকারবিরোধী বয়ানকে বিকশিত হতে সাহায্য করে।

নিঃসন্দেহে দেশভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সার্বভৌম ঋণ সঙ্কট, অতি মুদ্রাস্ফীতি এবং পণ্য ঘাটতির কারণে আরাগালায়া বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি সরকারবিরোধী অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। নেপালে, সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ছিল এর অনুঘটক।

এর পরবর্তী নির্বাচনগুলোও ভিন্ন ভিন্ন গতিপথ গ্রহণ করে। নেপাল যেখানে আমূল পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছে মার্চ মাসে সাবেক র‌্যাপার বলেন্দ্র শাহকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে সেখানে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ছেলে তারেক রহমানকে নির্বাচিত করে এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। নেপাল যেখানে প্রতিষ্ঠিত বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দল জনতা ভিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) নেতৃত্বাধীন একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বিপ্লবের পর

সম্প্রতি অঞ্চলটি সফরকালে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, আশাবাদ থাকা সত্ত্বেও তিনটি দেশই এখন একই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন করে শুরু করার আশা ও বিশ্বাসের একটি আবহ এখনো বিরাজ করছে। নতুন সরকারগুলো বিপুল নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যা একটি সুযোগের অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। এমনকি বাংলাদেশেও, যেখানে এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে, সেখানে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কারগুলো গণতান্ত্রিক নবায়নের অনুভূতিকে উৎসাহিত করেছে।

তবে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস এখন এই অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে যে, সরকারগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে তাদের অক্ষমতা বা অনিচ্ছার মাধ্যমে নিজেদের জনসমর্থন নষ্ট করছে। নতুন সরকারগুলোর অনভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত ভুল পদক্ষেপগুলো এই সন্দেহকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।

নেপালে, শাহ দুর্নীতিবিরোধী প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও, নতুন সরকারের দু’জন মন্ত্রী কেলেঙ্কারির সম্মুখীন হয়ে প্রথম মাসেই পদত্যাগ করেন। শ্রীলঙ্কায়, ব্যয় সঙ্কোচন নীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশা গত বছর ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ মোকাবেলায় সরকারের প্রতিক্রিয়ার কারণে আরো তীব্র হয়, যেটিকে কেউ কেউ অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন। বছরের শুরুতে স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভোটের হার কমে যায়।

বাংলাদেশে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সহিংস অপরাধ একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে, বিএনপি সরকার তার ক্ষমতা ক্ষুণœ করতে পারে এমন পরিবর্তন এড়াতে প্রস্তাবিত জুলাই সনদের রাজনৈতিক সংস্কারের কেবল অংশবিশেষই বাস্তবায়ন করতে পারে। এই বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দলটি তার প্রথম পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।

এই তিনটি দেশেরই দীর্ঘ সময় ধরে চলা সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার ইতিহাস রয়েছে। নেপাল, যা এক দশকব্যাপী মাওবাদী বিদ্রোহে জর্জরিত ছিল, সেখানে জাতি, প্রজন্ম, অঞ্চল এবং আদর্শগত বিভাজনসহ বিভিন্ন সামাজিক বিভাজন বিদ্যমান। ২০১৫ সালে পাস হওয়া একটি সংবিধান এই বিভাজনগুলো নিরসনের চেষ্টা করেছিল। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে নতুন সরকারের তরুণ শহুরে ভোটারদের তুষ্ট করার ওপর মনোযোগ দেওয়ার কারণে সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রীলঙ্কায়, সরকার জাতিভিত্তিক রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কয়েক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের পর, জাতিগত সিংহলী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ শ্রীলঙ্কার সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। এটি দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলিম তামিল সম্প্রদায়ের সাথে স্থায়ী পুনর্মিলনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

এ দিকে বাংলাদেশে মূল বিভাজনটি হলো দেশটির দু’টি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বংশীয় রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে। একটি বিশ্বাসযোগ্য যুব-নেতৃত্বাধীন ‘তৃতীয় ফ্রন্ট’ গঠনের প্রচেষ্টা নির্বাচনে ফলপ্রসূ হতে ব্যর্থ হয়েছে। আপাতত, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থগিত রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি টেকসই নয়; ঐতিহাসিকভাবে দেশকে জর্জরিত করে আসা প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র ভাঙতে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে দলটিকে পুনর্বাসন করা প্রয়োজন হবে।

ইরান যুদ্ধ এবং ভারত সম্পর্ক

ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে এই চাপগুলো আরো তীব্র হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির চাপ, জ্বালানি রেশনিং ও সঙ্ঘাতের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর জন্য সীমিত আর্থিক সংস্থানের কারণে তিনটি দেশই এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা সবাই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অর্থনৈতিক চাপগুলো নির্বাচন-পরবর্তী যেকোনো মধুচন্দ্রিমা পর্বকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে।

ভারতের সাথে সম্পর্ক আরেকটি চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। তিনটি দেশের সরকারই নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্কের পুনর্গঠন চাইছে, যা তাদের পূর্বসূরিদের আমলে তিক্ত হয়ে উঠেছিল। এই তিনটি দেশের জন্যই ভারত মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন সহায়তা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ইরান যুদ্ধ বৃহত্তর সমন্বয়ের সুযোগও সৃষ্টি করেছে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলো জ্বালানি ঘাটতির সম্মুখীন হওয়ায় নয়াদিল্লি তাদের কাছে জ্বালানি রফতানি বাড়িয়েছে।

তবে এই অঞ্চলে ভারতের প্রাধান্য তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অবিশ্বাসও সৃষ্টি করে, যারা তাদের বৃহত্তর প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাম্প্রতিক বিজয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য একটি মিশ্র আশীর্বাদ। এক দিকে এটি নয়াদিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সমন্বয় উন্নত করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলা ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি নবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে চারটিতেই বিজেপি বা তার সহযোগীরা এখন শাসন করায়, দলটির কখনো কখনো বিভাজনমূলক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে; বিজেপি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়ার পর সম্প্রতি সীমান্তে উত্তেজনা বেড়ে যায়।

নেপালে, প্রধানমন্ত্রী শাহের অপ্রত্যাশিত নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, যা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে দেখা করতে তার অস্বীকৃতি এবং সাম্প্রতিক একটি ভূখণ্ডগত বিরোধের উত্থানে দেখা গেছে। বিজেপি সম্প্রতি নেপালের শাসক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) আতিথ্য দিয়েছে এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপর জোর দেয়ার চেষ্টা করেছে, যদিও এটি নেপালের অভ্যন্তরে ফাটল ধরানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি করে।

ভারতের নিজস্ব রাজনীতিতেও এক ধরনের অস্থিরতা রয়েছে এবং এটি তার প্রতিবেশীদের মুখোমুখি হওয়া জেন জি প্রজন্মের চাপ থেকে মুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ুতে তরুণ ভোটাররা এপ্রিল মাসে রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে পরাজিত করতে একটি অপেক্ষাকৃত নতুন রাজনৈতিক দলকে (তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম, টিভিকে) সাহায্য করেছে বলে মনে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার ওপর, যেখানে নতুন রাজ্য সরকার সম্পর্কের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, বিশেষ করে মৎস্য শিকারের অধিকার এবং শ্রীলঙ্কার তামিলদের অধিকার নিয়ে সম্ভাব্য সঙ্ঘাতের বিষয়ে।

অন্য দিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আবির্ভাব ঘটেছে। এটি একটি যুব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন, যা অনলাইন ব্যঙ্গ হিসেবে শুরু হয়েছিল (ভারতের প্রধান বিচারপতি কিছু বেকার যুবককে ‘তেলাপোকা’র সাথে তুলনা করার পর এর সূত্রপাত হয়), কিন্তু এরপরেই তারা তাদের প্রথম গণ-সমাবেশ করেছে। যদিও ভারতের জেন জি আন্দোলনগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না, তবুও তারা এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।

এই প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ এশিয়ার নবনির্বাচিত সরকারগুলো অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, বাহ্যিক ধাক্কা ও কঠিন আঞ্চলিক সম্পর্কের মতো সাধারণ ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। যদি তারা এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে নতুন করে শুরু হওয়া বিক্ষোভের চাপে তারাও পড়তে পারে।