চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে

Printed Edition

বিশেষ প্রতিবেদক

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে এক দিকে শিল্পখাতে উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে, অন্য দিকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার আবাসিক গ্রাহকরা তীব্র গ্যাস সঙ্কটে ভুগছেন।

রাজধানীতে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান গ্যাস সরবরাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় সরবরাহ কমে দেয়া হয়েছে। যেটুকু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে তা নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোড বিশেষ করে শিল্প এলাকা পার হতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে রাজধানীতে গ্যাসের চাপ থাকছেই না। এটি স্বাভাবিক হতে আরো কমপক্ষে চার দিন লাগতে পারে বলে তিনি জানান।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শিল্প উৎপাদন, রফতানি কার্যক্রম এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সীমিত গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে আবাসিক লাইনে চাপ কমে যাচ্ছে এবং অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর কল্যাণপুর, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মিরপুর ও আদাবর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সকাল ও সন্ধ্যায় রান্নার ব্যস্ত সময়ে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে চুলা জ্বালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে তাদের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

কল্যাণপুরের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, গতকাল সরাদিনই গ্যাস সরবরাহ ছিল না। ফলে হোটেল থেকে খাবার কিনে হতে হয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে। সকালে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর আগে নাশতা তৈরি করা যায় না। অনেক সময় গভীর রাতে রান্না করতে হয়। লালমাটিয়ার আরেক বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান জানান, ‘গ্যাসের বিল নিয়মিত দিচ্ছি, কিন্তু প্রয়োজনের সময় গ্যাস পাচ্ছি না। প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানিকৃত এলএনজির সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কারণে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকাল ও শিল্প কার্যক্রম বৃদ্ধির ফলে গ্যাসের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে সীমিত সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও বর্তমানে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া আবাসিক খাতের এই দুর্ভোগ দ্রুত কাটবে না। শিল্প উৎপাদন সচল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বর্তমানে সেই ভারসাম্যের অভাবেই রাজধানীর হাজারো পরিবারকে প্রতিদিন গ্যাস সঙ্কটের ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে।