আহমেদ ইফতেখার
ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে ভিন্ন এক মেশিন লার্নিং প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সাইবার হামলা চালিয়েছে দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল। আর এই হামলার পুরো ঘটনা সম্পন্ন হয়েছে কোনো মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়াই!
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সাম্প্রতিক নজিরবিহীন সাইবার হামলার নেপথ্যে ছিল যৌথভাবে কাজ করা দুটি মডেল। প্রথমটি ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ এবং দ্বিতীয়টি প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা একটি তুলনামূলক শক্তিশালী ও উন্নততর মডেল। অভ্যন্তরীণ এক পরীক্ষার অংশ হিসেবে মডেল দুটিকে জটিল হামলার পথ ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত করার নির্দেশ দিয়েছিল কোম্পানিটি, যাতে এদের সাইবার সক্ষমতা পরিমাপ করা যায়।
তবে পরীক্ষার এক পর্যায়ে অপ্রত্যাশিতভাবে মডেল দুটি তাদের নির্ধারিত সিমুলেশন বা পরীক্ষামূলক পরিবেশের গন্ডি পেরিয়ে বাইরে চলে আসে। এরপর মানুষের কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়াই এরা নিজেদের ক্ষমতাবলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাগিং ফেইসের মেশিন লার্নিং রিপোজিটরিতে অননুমোদিত অনুপ্রবেশ ঘটায়।
মানুষের প্রাথমিক নির্দেশনা নিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে এমন একটি এআই এজেন্টকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বা স্যান্ডবক্সে পরীক্ষা করছিল তারা। এ সময় এআই এজেন্টটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করে স্যান্ডবক্স থেকে বের হয়ে যায়। এরপর বিশ্বের অন্যতম বড় এআই মডেল শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’-এর অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে হামলা চালায় এবং প্রবেশের চেষ্টা করে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির রেসপনসিবল এআই বিষয়ক অধ্যাপক জিনা নেফ বলেন, আমার মনে হচ্ছে ওপেন এআই যথেষ্ট নিরাপদ স্যান্ডবক্স তৈরি করতে পারেনি। এআই এজেন্টগুলো স্যান্ডবক্সের মধ্যেই দুর্বলতা খুঁজে বের করে এবং সেটির বিরুদ্ধে সাইবার হামলা চালিয়ে বেরিয়ে আসে। এরপর ওই এজেন্টগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে হাগিং ফেসকে শনাক্ত করে এবং সেখানে প্রবেশে করে। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের এআই মডেল অস্বাভাবিক কিছু নয়।
হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ ডেলাং সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সবকিছু যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এ ঘটনার তদন্ত চলছে। গ্রাহক বা অংশীদারদের কোনো তথ্য এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এআই এজেন্টের সাইবার হামলা চালানোর ঘটনা এটিই প্রথম হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এই ঘটনার পর উন্নত এআই ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সনিকওয়ালের নির্বাহী কর্মকর্তা স্পেন্সার স্টার্কি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন তাদের সাইবার নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে। বাস্তবতা হলো অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো মানুষের গতিতে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে, অথচ আক্রমণকারীরা কাজ করছে যন্ত্রের গতিতে।’
এ ঘটনাকে সাইবার নিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গাইডপয়েন্ট সিকিউরিটির প্রধান নিরাপত্তা প্রকৌশলী ট্রাভিস লেলে। তিনি বলেন, আক্রমণাত্মক এআই এজেন্টগুলোর কার্যত কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, কিন্তু প্রতিরক্ষামূলক এআই টুলগুলো নানা নিরাপত্তা সীমারেখায় আবদ্ধ। তবে ওপেন এআইয়ের এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা। ওপেন এআই বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।



