বিশেষ সংবাদদাতা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে গত এক দশকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে জ্বালানি-সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা এখন ক্রমেই নির্ভরতার রূপ নিচ্ছে। ভারত থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ আমদানি, ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের সাথে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রতিবেশী ভারতের সরবরাহব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কতটা নিরাপদ? আরো বড় প্রশ্ন- বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসঙ্কট মোকাবেলার নামে বাংলাদেশ কি এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ঢুকেছে, যার আর্থিক বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হবে?
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারের নিজস্ব পর্যালোচনা কমিটির তথ্যই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। কমিটির হিসাবে, আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক উৎসের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি অর্থ পরিশোধের আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বিডি রহমত উল্লাহ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভারতীয় কোম্পানি আদানির সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পুরোপুরি দেশবিরোধী চুক্তি। আর ভারতের সাথে যে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এতেও দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে। এখান থেকে তেমন কোনো বিদ্যুৎ পাওয়াই যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ভারতনির্ভরশীলতা কমানোর জন্য এবং দ্রুত সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ পেতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনোই বিকল্প নেই। রাজধানী ঢাকাতেই যদি প্রত্যেক বাড়ির ছাদে সোল্যার প্যানেল বসানো হয় তাহলে আগামী ৬-৭ মাসের মধ্যেই তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়েও গ্রাহকরা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে হবে। এজন্য দরকার নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি। আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীদের মতো যদি ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের আশায় থাকে তাহলে সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, দেশের এই দুর্দিনে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর জন্য সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিতে হবে। সরকার সহায়তা করলে স্বল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। প্রয়োজনে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে বাড়তি বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করতে পারবে। তিনি বলেন, এভাবে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যেই ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে। তখন ভারতের পাশাপাশি, আওয়ামী দলীয় নেতাকর্মীদের টাকা কামানোর জন্য দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও আর বিদ্যুৎ নিতে হবে না। উচ্চ মূল্যের জ্বালানি আমদানি করতে হবে না। সাশ্রয় হবে মানুষের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতেই বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে প্রায় ১৯ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের মোট বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয় ছিল প্রায় এক লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয়ের প্রায় ১৬ শতাংশই গেছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে। ভারত থেকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে ভারতের জাতীয় তাপবিদ্যুৎ করপোরেশনের বিদ্যুৎ বাণিজ্য শাখা ও পিটিসি ইন্ডিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়া ও আদানি পাওয়ার। কিন্তু ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে আদানি পাওয়ারের কাছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৮০৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনেছে। এর বিপরীতে পরিশোধ করেছে প্রায় ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ভারত থেকে কেনা মোট বিদ্যুতের অর্থের বড় একটি অংশ একটি বেসরকারি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে। এখানেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
আদানি চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা হয়েছে?
২০১৭ সালে আদানি পাওয়ারের সাথে ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে বাংলাদেশ। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেয়ার এই চুক্তির মেয়াদ ২০৪৮ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ একটি চুক্তির আর্থিক দায় থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে আসার সুযোগ খুব সীমিত। বিদ্যুতের চাহিদা পরিবর্তিত হলেও, দেশীয় উৎপাদন বাড়লেও কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুতের দাম কমলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের ওপর কার্যকর থাকার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি চুক্তিটি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে। কমিটির হিসাবে, আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের দাম ভারতের কাছাকাছি একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর তুলনায় প্রায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি এবং গ্রহণযোগ্য তুলনামূলক মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি হতে পারে। আরো উদ্বেগের বিষয়, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রায় ৪ থেকে ৫ মার্কিন সেন্ট বেশি পরিশোধের হিসাব দিয়েছে কমিটি। এখানে প্রশ্ন শুধু দামের নয়-চুক্তি করার সময় বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থান কতটা শক্ত ছিল, কোন পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং কেন তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়ের কাঠামো গ্রহণ করা হলো- এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
বছরে ৫-৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা
পর্যালোচনা কমিটির হিসাব অনুযায়ী, আদানি চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বছরে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বাড়তি ব্যয় করতে পারে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা। এটি কোনো আদালত বা আন্তর্জাতিক সালিশে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত ক্ষতির পরিমাণ নয়। এটি সরকারি পর্যালোচনা কমিটির মূল্যায়ন। কিন্তু এই হিসাব সত্য হলে প্রশ্ন আরো গুরুতর হয়ে ওঠে- একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করার অর্থনৈতিক যুক্তি কী? তুলনাটি আরো অস্বস্তিকর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম ছিল প্রায় ৭ টাকা ১৪ পয়সা প্রতি ইউনিট। পরিবহন ব্যয় যোগ করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা ৫৮ পয়সা। বিপরীতে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রায় ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা প্রতি ইউনিট। একই দেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এত বড় মূল্য ব্যবধান কেন- এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বকেয়া হলেই সরবরাহ কমার ঝুঁকি
২০২৪ সালের শেষ দিকে আদানি পাওয়ারের সাথে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যায়। একপর্যায়ে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসঙ্কেত। কোনো বিদেশী কোম্পানি বা দেশের ওপর বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়লে অর্থ পরিশোধে সামান্য সঙ্কটও জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ এখানে শুধু অর্থনৈতিক ঝুঁকি নেই; রয়েছে সরবরাহ নিরাপত্তার ঝুঁকি।
জ্বালানি তেলেও ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বাংলাদেশ
বিদ্যুতের পর জ্বালানি তেলেও ভারতের সাথে বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ছে। ভারতের আসাম রাজ্যের নুমালিগড় তেল শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে ডিজেল আসছে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে।
পাইপলাইনটি একদিকে দ্রুত জ্বালানি পরিবহনের সুবিধা দিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ভারতের একটি নির্দিষ্ট শোধনাগার ও পরিবহন অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করেছে। ২০২৬ সালে ভারত থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টন নি¤œ সালফারযুক্ত ডিজেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ প্রায় এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকার চুক্তি করেছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট চুক্তিতেই প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ভারতের সাথে পাইপলাইনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সংযোগ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা আরো বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
ভারতের ওপর অতিনির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কেন বিপজ্জনক?
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হলো বিকল্প কমে যাওয়া। একটি দেশ যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিদেশী উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই দেশ সঙ্কটের সময় দরকষাকষির ক্ষমতা হারাতে পারে। দ্বিতীয়ত, রয়েছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান বাড়বে। সেই ঘাটতি পূরণে সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়বে রাষ্ট্রীয় বাজেট অথবা সাধারণ গ্রাহকের ওপর। তৃতীয়ত, রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট দেখা দিলে একদিকে বকেয়া বাড়বে, অন্যদিকে সরবরাহকারীরা সরবরাহ কমানোর সুযোগ পাবে। চতুর্থত, রয়েছে কূটনৈতিক ঝুঁকি। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোনো বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে অতিরিক্ত জ্বালানি নির্ভরতা বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
সরকারকে এখন কী করতে হবে?
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থে সবচেয়ে জরুরি হলো ভারতনির্ভরতা কমানো। আদানি চুক্তির মূল্য নির্ধারণ, কয়লার দাম, কর, ক্ষমতা-চার্জ, সরবরাহের শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়- সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে চুক্তি পুনঃআলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থিক বোঝা কমাতে হবে।
একই সাথে ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পথ বাড়াতে হবে। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং দেশের নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োজন। ভারতীয় পাইপলাইন ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই এটিকে বাংলাদেশের প্রধান বা একমাত্র বিকল্প বানানো উচিত নয়। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।



