প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক ও মানবিক আচরণ এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং রোগীদের প্রতি সহমর্মী আচরণের বিকল্প নেই।
গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমান।
শহীদ মিলন চত্বরে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাস ও অবদান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা: জুবাইদা রহমানকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক শিক্ষার্থীর আঁকা আলোকচিত্র উপহার দেয়া হয়।
পরে তিনি শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ঐতিহ্য অক্ষুণœ রেখে এটিকে বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নীত করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যান, ফলে দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। মানুষের আস্থা অর্জন আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ ও সঠিক চিকিৎসাসেবাই সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যপরামর্শ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়। পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিতে বিশ্বাস করে। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে আগাম স্বাস্থ্যপরামর্শ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বহু রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারের বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, পেসমেকার, হার্টের ভাল্ব, চোখের লেন্স এবং ক্যান্সার চিকিৎসার কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ উপজেলা হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এ কারণে ৩১ ও ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
শিশু স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবার চাপ কমবে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য হবে।
মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য অপসারণ স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরো জানান, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি হাসপাতালে অতিরিক্ত আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনবল সঙ্কট দূর করতে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ বিভিন্ন পদের শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই রোগীর সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ আধুনিক চিকিৎসা, গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় দেশের নেতৃত্ব দেবে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা: মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা: এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা: হারুন আল রশিদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: নাজমুল হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ স্বাস্থ্যখাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক ও চিকিৎসকরা।



