নষ্ট মিটারে কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে ঢাবিকে

প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে নেই হিসাব

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

মিটার নষ্ট। ফলে প্রকৃতপক্ষে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, তার হিসাব নেই। এরপরও মাসের পর মাস একই অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো কোনো ভবন ও হলে বছরের পর বছর বদলায়নি বিলের পরিমাণও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিলের রেজিস্টার বিশ্লেষণ করে অন্তত ৯টি ভবন ও স্থাপনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে। রেজিস্টারে থাকা হিসাব অনুযায়ী, এসব নষ্ট মিটারের বিপরীতে কয়েক বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, মিটার নষ্ট থাকায় প্রকৃত ব্যবহার নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ডিপিডিসি আনুমানিক বা প্রাক্কলিত ব্যবহারের ভিত্তিতে বিল তৈরি করে। পরে সে বিলই বিশ্ববিদ্যালয় পরিশোধ করে। ফলে নষ্ট মিটার সচল না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় বেশি না কম-কত টাকা পরিশোধ করেছে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়।

মাসের পর মাস একই অঙ্কের বিল

বিদ্যুৎ বিলের রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান ভবন, কলা ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস (কারাস), উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, কবি সুফিয়া কামাল হল, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবন এবং আইবিএ হোস্টেলে দীর্ঘ সময় নষ্ট মিটারের বিপরীতে একই বা অনুমানভিত্তিক অঙ্কে বিল করা হয়েছে।

সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মিটার নম্বর ৩৬৩৯৮। ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাস ভবনটির মাসিক বিল ছিল পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৮৩ টাকা। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাস বিল করা হয় পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ২৯৪ টাকা করে। রেজিস্টারের হিসাবে ৩৬ মাসে মোট বিলের পরিমাণ প্রায় দুই কোটি পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।

কলা ভবনের মিটার নম্বর ২৮৬৭৬। রেজিস্টারে মিটারটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নষ্ট থাকার তথ্য রয়েছে। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাস প্রতি মাসে আট লাখ ২০ হাজার ১৬ টাকা করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নষ্ট মিটারের বিপরীতে ২১ মাসে বিল হয়েছে প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মিটার নম্বর ১৫৭০৯। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৯ টাকা করে বিল করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাস বিল করা হয় সাত লাখ ৫৯ হাজার ১০৮ টাকা করে। রেজিস্টারের হিসাবে তিন দফায় ৩৯ মাসে বিলের পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

কারাস ভবনের মিটার নম্বর ১২১০০১৪৫। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ মাস মাসিক সাত লাখ ৫৯ হাজার ১৫০ টাকা করে বিল করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাস সাত লাখ ৫১ হাজার ৫৯০ টাকা করে বিল লেখা হয়েছে। রেজিস্টারে মোট প্রায় ৩০ মাসের হিসাবে বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ টাকা।

উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের মিটার নম্বর ৯৫২৬১২১০০৯৫৭। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস প্রতি মাসে দুই লাখ ১৪ হাজার টাকা করে বিল করা হয়। এতে ওই সময়ে বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

কবি সুফিয়া কামাল হলের মিটার নম্বর ২০১২১২। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৭ মাস প্রতি মাসে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে বিল লেখা হয়েছে। এ সময়ে মোট বিল প্রায় এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মিটার নম্বর ১৫৮০৮। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ মাস ৭১ হাজার ২২ টাকা করে বিল করা হয়। ২০২২ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আট মাস বিল ছিল তিন লাখ ৬৯ হাজার টাকা করে। পরে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস তিন লাখ ৪৩ হাজার টাকা করে বিল করা হয়। মোট ৩১ মাসে বিল হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবনের মিটার নম্বর ৯৫০০৩৬১। ২০২১ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাস প্রতি মাসে চার লাখ ৬১ হাজার টাকা করে বিল করা হয়। এর পর বিভিন্ন সময়ে বিলের অঙ্ক পরিবর্তন হলেও একই অঙ্কে দীর্ঘ সময় বিল চলেছে। রেজিস্টারের হিসাবে মোট ৪৪ মাসে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় এক কোটি ৬৬ লাখ টাকার বিল হয়েছে।

সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের তথ্য পাওয়া গেছে আইবিএ হোস্টেলের ক্ষেত্রে। মিটার নম্বর ০০৪৭০। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩২ মাস, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭ মাস, ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ মাস, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাস এবং ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস একই অঙ্কে বিল করা হয়েছে। রেজিস্টারের হিসাবে মোট ১০১ মাস বা আট বছর পাঁচ মাসে বিল হয়েছে প্রায় দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা।

৯টি ভবন ও স্থাপনার রেজিস্টারভুক্ত হিসাব যোগ করলে নষ্ট মিটারের বিপরীতে বিলের পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

‘এস্টিমেটেড বিল দেওয়া হয়’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চচাপের (এইচটি) বৈদ্যুতিক মিটার সাধারণত ডিপিডিসি সরবরাহ করে। নষ্ট মিটার পরিবর্তনের জন্য ডিপিডিসিকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও তাদের স্টোরে প্রয়োজনীয় মিটার নেই বলে জানানো হয়। পরে খোলা বাজার থেকে উপযুক্ত ক্ষমতার মিটার কেনার পরামর্শ দেয় ডিপিডিসি।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ডিপিডিসির পরামর্শ অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এইচটি মিটার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ত্রুটিপূর্ণ মিটারগুলো প্রতিস্থাপন করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: লুৎফর রহমান বলেন, বিভিন্ন ভবনের মিটার নষ্ট থাকায় প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার নিরূপণ করা যাচ্ছে না। তাই গরম ও শীতকালের ব্যবহারের আনুমানিক গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কার্জন হলে মিটার নষ্ট থাকার সময় মাসে প্রায় তিন লাখ টাকা বিল এলেও মিটার ঠিক করার পর বিল বেড়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা হয়েছে। কলা ভবন ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের জন্য নতুন মিটার আনা হলেও সেগুলো এখনো চালু করা হয়নি।

ঢাবির নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবির মল্লিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি মিটার নষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে কারাস, শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবন, আবুল খায়ের ভবন, আইবিএ হোস্টেল এবং খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মিটার রয়েছে। নতুন মিটার স্থাপনের জন্য টেন্ডার হয়েছে এবং পাঁচটি মিটার স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

তাঁর মতে, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট মিটার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। নষ্ট মিটারের কারণে ডিপিডিসি প্রথমে আনুমানিক বিল তৈরি করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা প্রক্রিয়াজাত করে পরিশোধ করে।

ডিপিডিসির বক্তব্যে ভিন্ন সুর

তবে এ বিষয়ে ডিপিডিসির বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রায়হানুল আলম বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতি রয়েছে। তারা আনুমানিক গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে।’

নষ্ট মিটারের বিপরীতে এভাবে বিল পরিশোধ নিয়মবহির্ভূত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জানি। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ দায়িত্বশীলদের কেউ জানেন না, কেউ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি জানেন না জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক অথবা প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মো: আক্রাম হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি দেখছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘আপনি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরলে আমি তা গুরুত্বের সাথে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরাসরি উদ্যোগ নেব।’

ফলে প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর নষ্ট মিটারের বিপরীতে যে আনুমানিক বিল পরিশোধ করা হয়েছে, সেগুলোর সাথে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। নতুন মিটার স্থাপনের পর ভবনগুলোর বিলের অঙ্ক কতটা পরিবর্তিত হয়, সেটিও এখন দেখার বিষয়।