বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়

Printed Edition
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাঠে স্মরণীয় টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশ দলের উল্লাস  : ক্রিকইনফো
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাঠে স্মরণীয় টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশ দলের উল্লাস : ক্রিকইনফো

ক্রীড়া প্রতিবেদক

  • অস্ট্রেলিয়া ইনিংস : ১৯৮ ও ২৮৪
  • বাংলাদেশ ইনিংস : ৪২৬ ও ৫৭/১
  • ফল : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী

বিশ্বকে অবাক করা এক জয় ছিনিয়ে আনল বাংলাদেশের ক্রিকেট দল। অসাধারণ বা ঐতিহাসিক কোনো বিশেষণেই এ বিজয়ের বিশালত্ব বর্ণনা করার মতো নয়। টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যেকোনো দলের জন্যই অনেক বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর তা যদি হয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাহলে তো কথাই নেই। গতকাল ক্রিকেট বিশ্বের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এ জয়ের সংবাদটি ছিল বজ্রাঘাতের মতোই। আন্তর্জাতিক সব গণমাধ্যমেই বেশ গুরুত্বের সাথে ছাপা হয় বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া বধের খবর। অনেকের কাছেই এটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম এক অঘটন। প্রস্তুতি ম্যাচের ইনিংস পরাজয় যেখানে বড় হারের শঙ্কা জাগিয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের এমন সাবলীল জয় অকল্পনীয়ই ছিল। ব্যাটে-বলে দাপটের সাথে খেলেই সাড়ে তিন দিনেই জয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ দল। ২০০০ সালে টেস্ট অভিষেকের পর এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয় বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম জয়ের স্বাদ নিয়ে ইতিহাস গড়ল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২০০৩ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই ম্যাচই হেরেছিল বাংলাদেশ। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার টেস্ট ফরম্যাটে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। প্রথমবার ২০১৭ সালে মিরপুর টেস্ট ২০ রানে জিতেছিল টাইগাররা। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি। চলতি শতাব্দিতে ভারত ছাড়া এশিয়ার আর কোনো দেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয়ের স্বাদ পায়নি। এই জয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে উঠে এলো। শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার পরে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড।

৯ উইকেট ব্যবধানটা ছোট মনে হতে পারে; কিন্তু তার মাহাত্ম্য বিশাল। কারণ এই জয় এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। বাংলাদেশ শুধু ম্যাচ জেতেনি, ভেঙেছে সংশয়ের দেয়াল, মুছে দিয়েছে আন্ডারডগের পরিচয়। ক্রিকেটে বড় দল আর ছোট দলের পার্থক্য কাগজে-কলমে থাকতে পারে; মাঠে নয়। মাঠে কথা বলে সাহস, শৃঙ্খলা আর বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়েই বাংলাদেশ লিখেছে নতুন ইতিহাস। এ জয় আত্মমর্যাদার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লাল-সবুজের পতাকা মনে হয় একটু বেশি উঁচুতে উড়ছে। বাংলাদেশ এখন বড় স্বপ্ন দেখার দল।

ক্রিকেটের বিশ্বমানচিত্রে যে দলটি এখনো আন্ডারডগের কাতারেই থাকে, সেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিখল এক অভাবনীয় গল্প। প্রতিপক্ষ যখন ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া, তখন জয়টা সবার কাছেই স্বপ্নের মতো। পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে নামা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই স্বপ্ন পূরণ বাংলাদেশের। ৯ উইকেটের দাপুটে জয় দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বুকেই লাল-সবুজের মানচিত্র এঁকে দিয়েছে শান্ত বাহিনী। কোনো নাটকীয় জয় নয়, কোনো লড়াই নয়। প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ খেলেছে এগিয়ে থেকে। খেলার কোনো সময়ই অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে পারেনি। পাঁচ দিনের টেস্ট বাংলাদেশ জিতে নিলো চার দিন শেষ না হতেই। গতকাল অস্ট্রেলিয়া তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশর সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। এক উইকেট হারিয়েই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। দুই টেস্টের সিরিজ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকায়তে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো শুধু একটি জয় নয়, এটি আত্মবিশ্বাসের বিস্ফোরণ। যে মাটিতে প্রতিপক্ষকে সামলাতেই বড় বড় দলকে হিমশিম খেতে হয়, সেই মাটিতেই বাংলাদেশ দেখিয়ে দিলো, সাহস থাকলে অসম্ভব বলেও কিছু নেই। ব্যাটে-বলে, পরিকল্পনায়-প্রতিশ্রুতিতে সব বিভাগেই একসাথে জ্বলে উঠলে জয় যে কঠিন নয় তার প্রমাণ দিলো বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

শুরুটা ছিল বোলারদের হাত ধরে। অস্ট্রেলিয়ার মতো ব্যাটিং শক্তিকে ২০০ রানের আগেই গুটিয়ে দিয়ে জয়ের ভিত গড়ে দেন বোলাররা। এরপর ব্যাট হাতে তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি সেই ভিতের ওপর তুলে দেয় বিজয়ের মিনার। বলের সুইং, ব্যাটের মায়াবী ছন্দ আর ফিল্ডারদের ক্ষিপ্রতায় অস্ট্রেলিয়ার দাপট ধীরে ধীরে নিভে যায়।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে টসে জেতা স্বাগতিক দল ব্যাটিং বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এমনভাবে গুটিয়ে যাবে তারা ভাবেনি কেউ। তাদের ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করলে ২২৮ রানে পিছিয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ইনিংসে তৃতীয় দিন শেষে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছিল তারা। ৬ উইকেট হাতে নিয়ে ৬৭ রানে পিছিয়ে থাকলেও তাদের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে শঙ্কা ছিল বাংলাদেশ শিবিরে। কিন্তু সেই শঙ্কা আর সংশয় দূর করে দেন স্পিনার মেহেদি মিরাজ। ক্যামেরন গ্রিন ৪৩ ও অ্যালেক্স ক্যারি ১৯ রানে শুরু করেছিলেন চতুর্থ দিন। সপ্তম ওভারে অস্ট্রেলিয়া শিবিরে প্রথম আঘাত হানেন মিরাজ। উইকেটের পেছনে লিটন দাসকে ক্যাচ দিয়ে ৩০ রানে আউট হন ক্যারি। পঞ্চম উইকেট গ্রিন-ক্যারি ৫৬ রান যোগ করেন।

ক্যারির বিদায়ে নতুন ব্যাটার বো ওয়েবস্টারকে বেশিক্ষণ উইকেটে টিকতে দেননি মিরাজ। ব্যক্তিগত ৫ রানে ওয়েবস্টারকে বোল্ড করেন তিনি। ক্যারি ও ওয়েবস্টারের পর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকেও শিকার করেন মিরাজ। শর্ট লেগে সাদমান ইসলামের ক্যাচে মাত্র ৮ রানে সাজঘরে ফিরেন কামিন্স। ২০৭ রানে সপ্তম উইকেট হারায় অসিরা। ইনিংস জয়ের সম্ভাবনা জেগে ওঠে তখন। কিন্তু অষ্টম উইকেটে ৪৩ রানের জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে বড় লজ্জা থেকে বাঁচান। স্কোর আড়াই শ’তে নেন গ্রিন ও মিচেল স্টার্ক। ১৮ রান করা স্টার্ককে থামিয়ে জুটি ভাঙেন বাংলাদেশ পেসার তাসকিন আহমেদ। স্টার্ক ফেরার পর নাথান লায়নের সাথে জুটিতে টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় ও দেশের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন গ্রিন। তিন অঙ্কে পা দেয়ার পর ইনিংস বড় করতে পারেননি। পেসার হাসান মাহমুদের বলে বোল্ড হন তিনি। ৪ চার ও ১ ছক্কায় ২০১ বলে ১০৪ রান করেন গ্রিন।

দলীয় ২৭৮ রানে নবম ব্যাটার হিসেবে গ্রিন ফেরার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের শেষ ব্যাটার নাথান লায়নকে ১৫ রানে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মিরাজ। রিভিউ নিয়েও উইকেট বাঁচাতে পারেননি। ২৭ বলে ১৫ রান করেন তিনি। শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন জশ হ্যাজেলউড। ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা।

৬৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সফল বোলার মিরাজ। ৫৯ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৫তমবারের মতো ইনিংসে ৫ বা ততধিক উইকেট নিলেন মিরাজ। এ ছাড়া হাসান তিনটি, তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন একটি করে উইকেট নেন। জয়ের জন্য ৫৭ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে দ্বিতীয় ওভারে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমকে হারায় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার পেসার হ্যাজেলউডের শিকার হয়ে খালি হাতে সাজঘরে ফিরেন তিনি। দ্বিতীয় উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের স্বাচ্ছন্দ্যে খেলে রানের চাকা ঘুরিয়েছেন আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়নি বাংলাদেশকে। ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১৪.২ ওভারে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের স্বাদ দেন তারা। পেসার ওয়েবস্টারের বলে চার মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। সাদমান চারটি চারে ২৫ এবং দুই বাউন্ডারিতে মুমিনুল ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। হ্যাজেলউড ১ উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও বাংলাদেশ ৪২৬ রান করেছিল। প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে ৬ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন হাসান মাহমুদ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া ইনিংস : ১৯৮ ও ৯৫.১ওভারে (২৮৪/১০)(গ্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, মিরাজ ৫/৬৬)।

বাংলাদেশ ইনিংস : ৪২৬ ও (লক্ষ্য-৫৭) ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (সাদমান ২৫*, মুমিনুল ৩০*, হ্যাজেলউড ১/৫)।

ফল : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

সিরিজ : দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে বাংলাদেশ।

ম্যাচ সেরা : হাসান মাহমুদ (বাংলাদেশ)।

বিরোধীদলীয় নেতার অভিনন্দন

অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে অনুষ্ঠিত টেস্ট ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দুর্দান্ত ও ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, কোচ, কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান।

গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ওয়েল ডান! বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই লাল-সবুজ বিজয় সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দ, গৌরব ও মর্যাদার। খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জিং মেন্টাল স্ট্রেন্থ, এক্সেলেন্ট টিম স্পিরিট, সহনশীলতা এবং অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই এ অবিস্মরণীয় জয় সম্ভব হয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও আমাদের ক্রিকেটাররা মাঠে যে ধৈর্য ও লড়াইয়ের মানসিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সব খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা এবং দেশ-বিদেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমী জনতাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আশা করি, এই ধারা বজায় রেখে ভবিষ্যতে আমাদের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদাকে আরো উচ্চে তুলে ধরবেন এবং দেশের জন্য আরো বড় অর্জন বয়ে আনবেন। আমি খেলোয়াড়দের সাফল্য, সুস্বাস্থ্য এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।