চট্টগ্রাম ব্যুরো
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ১৬ আসনে দেড় দশকের আকাক্সক্ষার ভোট দিতে প্রস্তুত প্রায় ৬৭ লাখ ভোটার। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন এমনটাই আশা ভোটারদের। কিন্তু উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, মহানগরীর চট্টগ্রাম-১০সহ কয়েকটি আসনে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভোটের পরিবেশ নির্বিঘœ করতে ৪০ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ১১৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে তৎপর রয়েছে। বিজিবি ও র্যাবের বিশেষ ইউনিট মাঠে তৎপর বলেও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রিটার্নিং অফিস সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে এক হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে ৬৫৩টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশি ভাষায় এসব কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এ দিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার এক হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪৯০টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৭৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় মোট ৬০৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩১০টিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, ঘনবসতি, শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা ও ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে এসব কেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। মহানগরের পাঁচটি প্রধান নির্বাচনী এলাকায় কোতোয়ালি ও বাকলিয়া এলাকায় ঘিঞ্জি গলি ও অতিরিক্ত জনঘনত্ব, ডবলমুরিং ও পাহাড়তলীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা, বন্দর-পতেঙ্গা-ইপিজেড এলাকায় শ্রমিক অধ্যুষিত শিল্পাঞ্চল এবং খুলশী ও বায়েজীদে পাহাড়ঘেঁষা বসতির কারণে ঝুঁকি বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আসন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-পাহাড়তলী), যেখানে ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে ১১২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপে (চট্টগ্রাম-৩) ৮৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে যোগাযোগ সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ। নগর এলাকায় খুলশী থানার ৪৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৪টি কেন্দ্র এবং আকবরশাহ থানার সব (২২টি) কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামের ১৬টি থানার মধ্যে ছয়টি থানায় অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারের হিসাবে ৮১৫টি অস্ত্রের মধ্যে ৬১৭টি উদ্ধার হলেও এখনো ১৯৮টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পতিত সরকারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বৃহৎ রাজনৈতিক দলের হয়ে ঘোরাফেরা করছে এমন অভিযোগ মিলেছে স্থানীয়দের থেকে।
সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, মহানগরীর আকবারশাহ থানার ২২টি কেন্দ্র এবং খুলশী থানার অধিকাংশ কেন্দ্রের ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দেয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন।
উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান আসনটি সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত। আসনটির বাসিন্দারা বরাবরই ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘেœ ভোট দেয়ার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই সেখানে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বাড়ে। ইতোমধ্যে বহু খুনের সাথে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত রায়হান, আজিজ, ইলিয়াসরা প্রকাশ্যে ভোটের প্রচারণায় শামিল হওয়াতে সেই আফঙ্কা আরো জোরদার হয়েছে। ফলে আসনটিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন ভোটাররা।
এ দিকে ভোটারদের এমন শঙ্কার মধ্যে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে- চট্টগ্রামে ভোটের পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ৭১ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থাপন করা হয়েছে আসনভিত্তিক বেইজ ক্যাম্প।
র্যাব-৭ অধিনায়কের ব্রিফিং
চট্টগ্রামে র্যাবের ৪০টি টহল দল, একটি ডগ স্কোয়াড এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট কাজ করছে এবং এই টহল আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো: হাফিজুর রহমান । গতকাল বুধবার এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা জানান।
র্যাব-৭ অধিনায়ক জানান, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নির্বিঘœ করতে বিশেষ টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। শহর ও উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট। যেখানে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে চালানো হচ্ছে তল্লাশি। নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের নাশকতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয় সে জন্য সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার জাহিদুল ইসলাম মিঞা গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে পুরো চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।



