নারীদের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি শেরপুরে পরিত্যক্ত জমিতে ৫ স্তরের সবজি চাষ

Printed Edition
শেরপুরে এক কৃষাণীকে পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি অধিদফতরের এক কর্মকর্তা : নয়া দিগন্ত
শেরপুরে এক কৃষাণীকে পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি অধিদফতরের এক কর্মকর্তা : নয়া দিগন্ত

আকরাম হোসাইন শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা

এক সময় যে বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেখানে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে পাঁচ স্তরের বিষমুক্ত সবজি বাগান। পরিকল্পিত এই চাষাবাদে বদলে যাচ্ছে গ্রামের নারীদের জীবনযাত্রা, শক্তিশালী হচ্ছে পারিবারিক পুষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতি।

সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় সীমিত জমিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে পাঁচ স্তরে সবজি চাষ করা হচ্ছে। নিচু স্তরে কলমি ও পালং শাক, তার ওপরে মুলা, গাজর ও পেঁয়াজ, মাঝারি স্তরে বেগুন, টমেটো, মরিচ ও বরবটি, আর উঁচু মাচায় লাউ ও করলার চাষ করা হচ্ছে। একই জমিতে বহুমাত্রিক সবজি উৎপাদনের ফলে এক দিকে জমির সদ্ব্যবহার হচ্ছে, অন্য দিকে সারা বছর তাজা সবজির জোগান নিশ্চিত হচ্ছে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। অধিদফতরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে ‘ফিল্ড স্কুল’ পরিচালনা করা হয়। শেরপুর উপজেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) আব্দুল আজিজের তত্ত্বাবধানে ২৫ জন কৃষক ও কৃষাণীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয় উপকারভোগী নাদিয়া আক্তার নেহা ও জাহানারা বেগম জানান, আগে বাড়ির আঙিনা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকত। এখন সেই জায়গায় বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করতে পারছি। এসব সবজি নিজ পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সহায়তা করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয়ও হচ্ছে। এতে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আমাদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ববিতা খাতুন ও তাসলিমা বেগম বলেন, এত অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে এত বৈচিত্র্যের সবজি চাষ করা যায়- এ ধারণা আগে ছিল না। এখন আমাদের দেখাদেখি পাশের গ্রামগুলোর মানুষও আগ্রহী হয়ে উঠছে। অনেকেই বাড়ির আঙিনাকে কাজে লাগাতে প্রশিক্ষণ নেয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।

উপকারভোগী মুক্তার হোসেন বলেন, বাজারে সবজির দাম বেশি থাকায় নিয়মিত কেনা হয়ে উঠে না। এখন নিজের আঙিনায় উৎপাদিত সবজি দিয়ে খরচ বাঁচছে। আবার বাড়তি সবজি বিক্রি করে সংসারের জন্য কিছুটা উপার্জনও হচ্ছে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল বাড়ির আঙিনাকে পুষ্টির ভাণ্ডারে পরিণত করা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা এখন স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এই মডেলটি পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, আমিনপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের এই উদ্যোগ জাতীয় পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সাথে নারীর ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এটি একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকলে এই পাঁচ স্তরের সবজি চাষ শেরপুর ছাড়িয়ে জেলার অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে- যা গ্রামীণ জীবনে টেকসই পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।