চৌগাছায় তিন মাসেই বেহাল ৪ কোটি টাকার সড়ক

Printed Edition
উদ্বোধনের চার মাস পরই সড়কের পিচ উঠে যাচ্ছে : নয়া দিগন্ত
উদ্বোধনের চার মাস পরই সড়কের পিচ উঠে যাচ্ছে : নয়া দিগন্ত

চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা

যশোরের চৌগাছা উপজেলার চৌগাছা-পুড়াপাড়া সড়ক সংস্কারে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হলেও উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মাথায় সড়কটির বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান ও সাধারণ মানুষদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, তদারকির দুর্বলতা এবং ঠিকাদারি কাজে অনিয়মের কারণেই নতুন সড়কের এমন বেহাল অবস্থা হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ চৌগাছা-পুড়াপাড়া সড়কটি দু’টি প্যাকেজে সংস্কার করা হয়। একটি অংশের কাজ পায় আরহাম এন্টারপ্রাইজ, যার চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অন্য অংশের কাজ পায় রানা এন্টারপ্রাইজ, যার চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় দুই কোটি টাকা। সবমিলিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় চার কোটি টাকা। গত ৯ মার্চ সংস্কার শেষে সড়কটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ উঠে গেছে, কোথাও কোথাও খোয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। বিশেষ করে বর্ষার পানিতে গর্তগুলো আরো বড় হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজ চলাকালেই তারা নিম্নমানের ইটের খোয়া, বিটুমিন ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দফতরের পক্ষ থেকে অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি। ফলে কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের প্রকৃত চিত্র বেড়িয়ে আসছে।

স্বরূপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল কদর বলেন, দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় এলাকাবাসী সড়ক সংস্কারে খুশি হয়েছিল। কিন্তু সংস্কার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ইটের খোয়া। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আন্দারকোটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক তমজিদ হোসেন বলেন, সংস্কারকাজে নিম্নমানের ইট, বালু ও বিটুমিন ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরনো ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান মন্টু বলেন, কাজ চলাকালে তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলীকে একাধিকবার মৌখিকভাবে অনিয়মের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। তাই জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত মানসম্মতভাবে সড়কটি পুনঃসংস্কারের দাবি জানান তিনি।

অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে আরহাম এন্টারপ্রাইজের মালিক সাকিব আহমেদ বলেন, টেন্ডার পাওয়ার পর তিনি কাজটি সানি এন্টারপ্রাইজের কাছে হস্তান্তর করেন এবং তারাই কাজটি সম্পন্ন করেছেন। অন্য দিকে রানা এন্টারপ্রাইজের কাজ বাস্তবায়নকারী সাব-কন্ট্রাক্টর সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি চুক্তির ভিত্তিতেই কাজ করেছেন। কাজের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দিতে পারবেন।

যশোর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঠিকাদারি কাজ হাতবদল হওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের ছবি ও ভিডিও পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তাদের নিজস্ব ব্যয়ে দ্রুত সড়কটি মেরামতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু দায়সারা মেরামত নয়, পুরো সংস্কারকাজের মান যাচাই করে প্রয়োজন হলে স্বাধীন কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। তাদের মতে, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া জনস্বার্থ ও জবাবদিহিতার প্রশ্নই সামনে আসে।