সূচকের অবনতিতে পুঁজিবাজারে নতুন সপ্তাহ শুরু

দরপতনের শিকার ৭৬ শতাংশ কোম্পানি ও ফান্ড

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

গত সপ্তাহের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির পর আবারো সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের অবনতি ঘটে। উভয় বাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির ৭৫ শতাংশের বেশি দরপতনের শিকার হয়। পাশাপাশি বড় ধরনের অবনতি ঘটে বাজারগুলোর লেনদেনেও। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে যা বাজারের মূল্যস্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। আর বাজার এখনো পুরোপুরি টেকসই না হওয়ায় মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ছে বাজারগুলো। তবে এটাকে তারা স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবেই দেখছেন।

গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বাজারগুলোতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৫ হাজার ৬৬১ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি প্রথম ১০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৭০৮ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৪৭ পয়েন্ট। সূচকের এ অবস্থান থেকেই সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। বেলা পৌনে ১টার দিকে ডিএসই সূচকটি নেমে আসে পাঁচ হাজার ৬৭৪ পয়েন্টে। প্রথম দিকের এ চাপ সামলে কিছুক্ষণের মধ্যে ফের ঊর্র্ধ্বমুখী হয় সূচকটি। বেলা সোয়া ১টার ডিএসই সূচকের অবস্থান ছিল পাঁচ হাজার ৬৯০ পয়েন্টে। তখনও বাজারটি সূচকের প্রায় ৩০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। এর পরপরই বিক্রয়চাপ তীব্র হতে শুরু করে। দিনের বাকি সময় চাপ সামলে বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২১ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। দিন শেষে সূচক নেমে আসে পাঁচ হাজার ৬৩৯ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে ১ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ১১৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ১৫ হাজার ৩৫৪ দশমিক ০৬ পয়েন্ট নিয়ে শুরু করা সূচকটি লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ২৩৮ দশমিক ৭৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৭৬ ও ৬৭ দশমিক ৯২ পয়েন্ট।

ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল এক হাজার দুই কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৯৫ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। ডিএসইর এই লেনদেন গত ১৩ কর্মদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত ২ জুনের পর ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন এতে কম হয়নি। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার ৩০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৫৪ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার অর্থাৎ গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সিএসইর লেনদেন ছিল ৮৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, গতকাল সূচকের অবনতির তুলনায় লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বড় অংশই দরপতনের শিকার ছিল। কিন্তু গ্রামীণ ফোন ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো কয়েকটি বড় মূলধনের কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধিই বাজারকে বড় পতন থেকে রক্ষা করে। তাদের মতে, সম্প্রতি ডিএসই কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম বন্ধ থাকা ও নিরীক্ষকের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির দুটি তালিকা প্রকাশ করে যা পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলোর ভিতরের অবস্থা বিনিয়োগকারীদের সামনে নিয়ে আসে। বেশ কিছুদিন ধরে এসব কোম্পানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে চলছিল। বাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এ তালিকা প্রকাশ করে ডিএসই। গতকাল এ তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই দরপতনের শিকার হয়। তবে তারা মনে করেন, বেশ কিছুদিন যাবৎ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ যেভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলো নিয়ে বাজারে অযৌক্তিক খেলায় মেতে উঠেছিল তা রোধ করতে তালিকা প্রকাশ ছাড়া ডিএসইর পথ ছিল না।

সংশ্লিষ্টদের এ কথার সত্যতা পাওয়া যায় গতকাল ডিএসইর লেনদেন চিত্রে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির প্রায় ৭৬ শতাংশ দরপতনের শিকার। দরপতনের শীর্ষ কোম্পানির প্রায় সব ক’টিই ছিল এ তালিকায় থাকা। ঢাকায় গতকাল নেয়া ৩৯৬টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৭১টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৯৮টি। অপরিবর্তিত ছিল ৩৭টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টকে ২২৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৬৩টির দাম বাড়লেও কমেছে ১৪৩টির। অপরিবর্তিত ছিল ২০টির দর।

ডিএসইতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ৫০ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৯ লাখ ৮৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৯ কোটি ৭১ লাখ টাকায় ৭১ লাখ ৪৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইপিডিসি, রবি অজিয়াটা, এনসিসিবি, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সিম টেক্সটাইলস, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও কেডিএস অ্যাক্সেসরিজ।

গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষে ছিল প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, হার ছিল ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিম টেক্সটাইলস। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে কেডিএস অ্যাক্সেসরিজ, আইসিবি অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, সিকদার ইন্স্যুরেন্স, ন্যাশনাল ফিড মিলস, জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিক্যাল ডিভাইসেস ও বিডি কম অনলাইন।

দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ। ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ দর হারায় বিবিধ খাতের এ কোম্পানি। একই হারে দর পতনের শিকার বেক্সিমকো লিমিটেড ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। গতকাল নিয়ে কোম্পানিটি টানা ৯টি কর্মদিবস দিনের সর্বোচ্চ দরপতনের শিকার হলো। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রিজেন্ট টেক্সটাইলস, তুং হাই টেক্সটাইলস, উসমানিয়া গ্লাস শীট ফ্যাক্টরি, ফারইস্ট ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ও সাইফ পাওয়ারটেক।