নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্ধকারের নিজস্ব কিছু নিয়ম থাকে; তা কখনো আড়াল খোঁজে, আবার কখনো ক্ষমতার দাপটে হয়ে ওঠে আরো দুঃসাহসী। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির সেই এক কনকনে রাতে বরিশালের সীমান্ত ঘেরা জনপদে বন্দুকযুদ্ধের যে সাজানো নাটকের চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল স্রেফ দুটো প্রাণ কেড়ে নেয়ার বিনিময়ে রক্তভেজা কিছু টাকার লোভ। দীর্ঘ এক দশক পর এখন যখন ক্ষমতার সেই আড়াল সরে গেছে, তখন কাঠগড়ায় দাড়িয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা শোনালেন ক্ষমতার অন্ধকার অলিন্দে বসে সাজানো সেই নৃশংসতার নির্মম উপাখ্যান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গতকাল সোমবার দেয়া এক বিস্ফোরক জবানবন্দীতে তৎকালীন উজিরপুর থানার সেকেন্ড অফিসার এবং বর্তমানে বরিশাল মহানগর সিআইডির পরিদর্শক মো: আলী আহম্মেদ জানান, ২০১৫ সালে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ারে’ দিয়ে নগদ ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন পুলিশের দুই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)। তৎকালীন ক্ষমতার বলয়ে থাকা এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) প্রত্যক্ষ ছায়াতলে সেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রূপ দেয়া হয়েছিল।
জবানবন্দীতে সাক্ষী সেই রাতের বিবরণ দিয়ে বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে তৎকালীন বরিশাল জেলা এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহ উজিরপুর থানায় এসে ওসির সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকের পরপরই ওসির নির্দেশে অন্য থানায় কর্মরত দুই বেপরোয়া সদস্য এএসআই মো: মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই মো: জসিম উদ্দিনকে এসপির বিশেষ নির্দেশনায় এক বিশেষ অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়। এর পরদিনই অগ্নিকাণ্ডের মতো ছড়িয়ে পড়ে খবর আগৈলঝাড়ায় পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
হত্যার পর সেই দুই এএসআইকে টানা প্রায় এক মাস সমস্ত ডিউটি থেকে আড়াল করে রাখা হয়। তাদের মানসিক অস্থিরতা ও চালচলনের অস্বাভাবিকতা থেকে সহকর্মীদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হলে জানা যায়, এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও এসপি এহসানউল্লাহর নির্দেশে এই ক্রসফায়ার বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। আর সেই সফল ‘অপারেশনের’ উপহার হিসেবেই মিলেছিল নগদ ২৫ হাজার টাকার বকশিস। নিজের সহকর্মীদের এই অন্ধকার চেহারা ট্রাইব্যুনালে উন্মোচন করে সাক্ষী জানান, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তৎকালীন সময়ে এরা সারা দেশে ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছিল। চার আসামির এই মামলায় মূল দুই বাস্তবায়নকারী সাবেক এএসআই এখন কারাবন্দী হলেও পর্দার পেছনের দুই খলনায়ক সাবেক এমপি ও এসপি এখনো পলাতক।



