অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজার নিয়ে হতাশা দিনদিন বাড়ছে। টানা তিন সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিক পতনের মধ্য দিয়ে পার করা পুঁজিবাজারগুলোতে গতকাল নতুন সপ্তাহের শুরুতেও বাজার আচরণের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং বিগত দিনগুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সূচকের বড় অবনতিতেই গতকাল দিন শেষ করেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেন শুরুর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে শুরু হয় বিক্রয়চাপ। পরে বেশ ক’বার বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকরা বরাবরের মতোই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটকেই চলমান বাজার আচরণের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বেশ কিছুদিন ধরে চলতে থাকা জ¦ালানি সঙ্কট দেশের অর্থনীতিকে অনেকটা স্থবির করে তুলেছে। পুঁজিবাজার পুরোপুরিই উৎপাদন ও সেবা খাত নির্ভর। ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাব পুঁজিবাজারেই প্রথম পড়ে। সাম্প্রতিক পুঁজিবাজার আচরণের এটাই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। এ কারণেই গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের শেষ মুহূর্তে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা স্বস্থি ফেরালেও তা টেকেনি।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪১ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট হারায়। দিনের শুরুতে কিছুক্ষণের জন্য বাজারটির সব সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মাত্র দশ মিনিটের মাথায় বিক্রয়চাপে পড়ে বাজারটি। মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে বেলা ১১টার মধ্যে সূচকটির ৩২ পয়েন্টের বেশি অবনতি ঘটে। কিন্তু পরে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে সাময়িকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচকটি। কিন্তু সূচকের এই ঊর্ধমুখী আচরণ বেশিক্ষণ টেকেনি। দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি আবার ২৭ পয়েন্ট হারিয়ে বসে। দুপুর ১২টার পর নতুনভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বেলা পৌণে ১টার দিকে হারানো সূচকের পুরোটাই ফিরে পায়। কিন্তু বেলা ১টার দিকে বিক্রয়চাপ আবার বাড়তে থাকে। দিনের বাকি সময় এ চাপ অব্যাহত থাকলে বড় পতন ঘটে সূচকটির। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১২ দশমিক ৬৫ ও ৪ দশমিক ৪২ পয়েন্ট।
অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৫ হাজার ১৬৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেনশেষে নেমে আসে ১৫ হাজার ৯১ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৭৯ দশমিক ৩৭ ও ৫৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট।
সূচকের টানা এ অবনতি বিনিয়োগকারীদের হতাশা দিনদিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং ফ্লোরে উপস্থিত বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে তাদের এই হতাশার কথা জানান। তারা বলেন, নতুন সরকার পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নানা ধরনের আশার বাণী শোনালেও দায়িত্ব নেয়ার পর দৃশ্যমান কিছুই করেনি। তার ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসইর নেয়া কিছু পদক্ষেপ বাজারকে আরো অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব পদক্ষেপের কারণে সূচকের টানা পতনের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা ক্রমান্বয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গত এক মাসের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা থেকে ৫০০ কোটিতে নেমে আসার এটাই কারণ বলে মনে করেন তারা। চলমান এই সঙ্কট কাটিয়ে পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে দুই সংস্থারই আশু উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ দিকে পুঁজিবাজারের চলমান নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আজ সব স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকার্সদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। আজ সোমবার বেলা ২টা থেকে নিকুঞ্জে ডিএসইর সম্মেলন কক্ষে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের পক্ষ থেকে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়।
ওই উন্মুক্ত আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত থাকবেন বিএসইসির কমিশনার তানভির হাবিব রহমান সিপিএ, কমিশনার নাহিদ মাহতাব, কমিশনার মো: নাফিজ আল তারেক সিএফএ, কমিশনার হোসাইন সাদাত এফসিএস। বিশেষ অতিথি হিসেবে ডিএসই চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারও সভায় উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে বস্ত্র খাতের কোম্পানি সায়হাম টেক্সটাইলস।
২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৭৭ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২১ কোটি ২৪ লাখ টাকায় ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সায়হাম কটন মিলস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, সামিট অন্যালাইয়েন্স পোর্ট, লাভেলো আইসক্রিম, বেক্সিমকো লিমিটেড, মালেক স্পিনিং, এমএল ডাইং ও আইপিডিসি ফিন্যান্স।
এ দিকে গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের সায়হাম কটন মিলস। গতকাল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের সায়হাম টেক্সটাইলস। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সেনা ইন্স্যুরেন্স, মুন্নু ফেব্রিক্স, সোনালি আঁশ, আরগন ডেনিমস, সিমটেক্স প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলসও ইভিন্স টেক্সটাইলস।



