আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের ব্যবসায়ী নেতারা রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন কর কাঠামোর আধুনিকায়ন, নীতিগত স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের জটিলতা, নীতির অসঙ্গতি এবং প্রশাসনিক হয়রানি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আগামী বাজেটে রাজস্ব সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রত্যাশার নিচে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে ১৫ শতাংশের ওপরে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তারা বলছেন, জটিল ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থা, ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন, উচ্চ শুল্ক এবং প্রশাসনিক হয়রানির কারণে বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, শুধু করহার বাড়িয়ে নয় বরং কর কাঠামো সহজীকরণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, করজাল সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নীতির মাধ্যমেই রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব। তাই এবারের বাজেটে ব্যবসাবান্ধব ও আধুনিক রাজস্ব সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ।
ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি মধ্যে রয়েছে কর নীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তারা বলছেন, বছরে একাধিকবার কর নীতির পরিবর্তন ব্যবসায় পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সম্পূরক শুল্ক, আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কাঠামোয় আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা চান, অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটি নির্ধারিত কর নীতির রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক, যাতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।
মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কারও ব্যবসায়ী নেতাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন জমা ও অডিট প্রক্রিয়াকে তারা জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালু হলেও এখনো অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে, যা দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগ সৃষ্টি করে। তাদের দাবি, সম্পূর্ণ ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরলিকৃত ভ্যাট কাঠামো চালু করতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, একই ভ্যাট ফাইলে একাধিক দফতরের ব্যাখ্যা ভিন্ন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি চাপে পড়তে হয়।
আয়কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর দাবিও জোরালো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একই ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিন্ন ভিন্ন কর ব্যাখ্যা প্রয়োগ করা হয়, যা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তারা চান, কর আইনের ব্যাখ্যায় একক নীতিমালা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা চালু করা হোক। বর্তমানে কর মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়ে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের মতে, কর আপিল প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে করদাতাদের আস্থা বাড়বে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রফতানিমুখী শিল্পে করসুবিধা অব্যাহত রাখা জরুরি। উৎসে কর ও রফতানি প্রণোদনার নীতিতে স্থিতিশীলতা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাবে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর নতুন বাণিজ্য বাস্তবতায় কর নীতি আরো কৌশলগত হওয়া প্রয়োজন।
এ দিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলোর দাবি, এসএমই খাতের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং সহজ কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করা হোক। বর্তমানে ছোট ব্যবসায়ীরা জটিল কর ব্যবস্থার কারণে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশে অনীহা দেখান। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়ানো গেলে রাজস্বও বাড়বে, পাশাপাশি অর্থনীতিও হবে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক। তারা আরো বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অন্তত প্রথম তিন বছর বিশেষ করসুবিধা দেয়া উচিত।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, একই পণ্যে একাধিক স্তরের কর ও শুল্ক ব্যবসা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক স্থানীয় উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। তিনি বাজেটে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে কর প্রণোদনা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন উচ্চ শুল্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ডিসিসিআই সভাপতি কর প্রশাসনে মানবিক আচরণ ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের আচরণ ব্যবসাবান্ধব নয় এবং অপ্রয়োজনীয় নথি চাওয়ার মাধ্যমে হয়রানি করা হয়। এজন্য কর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল নজরদারি ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন করদাতা যুক্ত না করে শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ালে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর কর শনাক্তকরণ এবং ডেটা সমন্বয়ের মাধ্যমে করজাল বাড়ানোর পরামর্শ দেন। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন ও জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বাজেটে সরকার যদি রাজস্ব সংস্কারে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে যেমন কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করহার যৌক্তিকীকরণ, করজাল সম্প্রসারণ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এতে শুধু রাজস্ব আদায়ই বাড়াবে না, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত করবে বলে তারা মনে করছেন।



