হোয়াটসঅ্যাপ কলে কাঁপছে চট্টগ্রাম নতুন আতঙ্ক ডেভিড ইমন

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ৮ জন গ্রেফতার

Printed Edition

ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন আতঙ্কের নাম মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। একসময় চাঁদাবাজির ঘটনা গোপনে ঘটলেও এখন তা প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে নগরবাসীর সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এখন একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলই যেন কোটি টাকার হুমকির সমান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে পরিণতি কী হতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ নগরের চন্দনপুরায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা। এ ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে আটজনকে গ্রেফতারের দাবি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক মাসে অন্তত তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদেশী নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এর মধ্যে অন্তত দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করেছে এই চক্র। আর সর্বশেষ চাঁদা না পাওয়ার জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয় নজিরবিহীন হামলা।

দুই কোটি টাকা না দেয়ায় রক্তচক্ষু

গত ১১ জুলাই ডিডিএনের কর্ণধার আদিল বিন মামুনের মোবাইলে বিদেশী নম্বর থেকে ফোন আসে। কলদাতা নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাইলে টাকা দিতে হবে, অন্যথায় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাবে।

চাঁদা না দেয়ার দুই দিনের মাথায় ১৩ জুলাই দুপুরে চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস রোডে ডিডিএনের কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র হামলাকারী ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে এবং বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভিতে ধারণ হয় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেয়ার কারণেই তার প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

এক কলেই লাখ লাখ টাকা!

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ডেভিড ইমন পরিচয়ে ব্যবসায়ীদের হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হয়। প্রথমে পরিচয় নিশ্চিত করে ব্যবসার আকার-আয় সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়, এরপর মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগের হামলা ও হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। প্রাণনাশের আশঙ্কায় অনেকে বিষয়টি প্রকাশ না করে চাঁদা দিয়ে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ ব্যবসা, পরিবহন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।

ডিডিএনের পর ‘নেট প্লাস’ও হুমকিতে

ডিডিএনে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নগরের জিইসি মোড়ে অবস্থিত আরেকটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নেট প্লাসের কর্ণধার নেওয়াজ মোরশেদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কল আসে।

তিনি জানান, কলদাতা নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে বলেন, ডিডিএনের অবস্থা দেখেছেন তো। টাকা না দিলে আপনাদেরও একই পরিণতি হবে। এ ঘটনার পর নগরের আইএসপি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কে এই ডেভিড ইমন?

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ‘ডেভিড ইমন’ নামে অপরাধ জগতে তেমন পরিচিত কেউ ছিলেন না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের কৃষক পরিবারের সন্তান মোবারক হোসেন ইমন অল্পবয়সে কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েন। পরে সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়ে সংগঠনের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি বড় সাজ্জাদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত। বড় সাজ্জাদ বিদেশে পলাতক থাকলেও চট্টগ্রামে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান।

সাতটি খুনের মামলার আসামি : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও হাসান হত্যাকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তার কাছে ১৫ থেকে ২০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে এবং অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ।

৫০ শুটারের সন্ত্রাসী বাহিনী : গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ গ্রুপে বর্তমানে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় শুটার ও সহযোগী রয়েছে। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান, হাটহাজারী এবং ফটিকছড়িতে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন নগর অংশ এবং মোহাম্মদ রায়হান জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপ পরিচালনা করছেন।

গ্রেফতার ৮ সন্ত্রাসী : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, মোবারক হোসেন ইমন একজন পলাতক সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ডিডিএনে হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কল রেকর্ডের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এটি সত্যিই তার কণ্ঠ কি না- তা যাচাই চলছে। তাকে গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে চকবাজার থানা, সিএমপির একাধিক বিশেষ টিম এবং র‌্যাব-৭ যৌথভাবে মঙ্গলবার রাতভর অভিযান চালিয়ে ডিডিএনে হামলায় অংশ নেয়া আটজনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন- মো: ইউনুস (৪১), ইমরান হোসেন চ্যাং (৩১), আকবর হোসেন (২৪), মো: সুমন (২৭), মো: মনির ওরফে কেহেরমান (৩৮), মো: গিয়াস উদ্দিন (২১), মো: নয়ন (২০) এবং মোহাম্মদ আবদুল নাহিদ ওরফে ফরহাদ (২৮)। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।