নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্স সেবা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার পাশাপাশি এর সাথে যুক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চার্জ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো: আব্দুস সালাম। তিনি বলেছেন, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়নের নির্ধারিত ফির সাথে এনবিআরের চার্জ রয়েছে। এ চার্জ কমানো সম্ভব হলে ট্রেড লাইসেন্সের ফিও কমানো সম্ভব হবে।
গতকাল রাজধানীর ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও ডিএসসিসির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ট্রেড লাইসেন্স সেবা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। একই অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি এলাকায় ব্যবসায়ীদের জন্য সপ্তাহব্যাপী ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে একদিকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে নগরবাসীকে আরো উন্নত সেবা দেয়া সম্ভব হবে। ডিএসসিসির আওতায় বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তাই যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেই, তাদের নতুন লাইসেন্স নেয়া এবং পুরনো লাইসেন্স নবায়নের মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
ডিএসসিসির কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি শনিবার গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ব্যবসায়ীসহ নগরবাসী তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও মতামত তুলে ধরতে পারবেন। নগরবাসীর অভিযোগ ও পরামর্শের ভিত্তিতে সেবা কার্যক্রম আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ট্রেড লাইসেন্স সেবায় হয়রানি বন্ধে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ব্যবসায়ীদের দ্রুত ও সহজে সেবা দিতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এ ব্যবস্থা চালু হলে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: খয়বর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ২৯৪ ধরনের ব্যবসার বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ ৪৬ হাজার ১৮০টি ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডিএসসিসির রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ীসহ নগরবাসীর সার্বিক সহযোগিতার আহবান জানান।
তিনি বলেন, নগরীর যানজট নিরসনেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎচালিত অটোরিকশা ও হকারদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যানজট কমাতে কিছু সড়কে একমুখী যান চলাচল চালুর বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এসময় ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। কিন্তু লাইসেন্স নিবন্ধন ও নবায়নের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতা, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দফতরে যাতায়াত এবং বিভিন্ন ধাপে সময়ক্ষেপণের কারণে উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ ধরনের সমস্যা দূর করতে ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসায়িক বিভিন্ন সেবা কার্যকরভাবে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
একই সাথে একাধিক বছরের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া যত সহজ ও দ্রুত করা যাবে, দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ তত বেশি অনুকূল হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাথে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো: মাসুদ করিম। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহায়ক না হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতিশীলতা আসে না। তাই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ডিএমপির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান থেকে মালামাল খালাসের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
যানজট নিয়ন্ত্রণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে বলেও জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা। এ কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নীতিমালা সম্পন্ন হলে অটোরিকশাগুলোকে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট দেয়ার মাধ্যমে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ফি কমানো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় হয়রানিমুক্ত নবায়নসেবা নিশ্চিত করা, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন, অটোরিকশার নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট প্রদান, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
এ দিকে, ১৬ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসেবা দেয়া হবে। ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকার ডিসিসিআইয়ের সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ অন্য ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেন।



