মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের ভয়াবহ উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। জেলার গোপীনাথপুর, দত্তপাথিলা, ডিহিকৃষ্ণপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছেন বলে জানা যায়। স্থানীয়রা জানায়, আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় গত ২০ বছরে এসব এলাকায় প্রায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের অনেকের হাতের তালু ও পায়ের তলায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। কারো কারো অঙ্গহানিও হয়েছে।
তবে এ পরিস্থিতির সাথে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানের রয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে চুয়াডাঙ্গায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শূন্য। চলতি মাসেও রোগীর সংখ্যা শূন্য দেখিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি জেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে আর্সেনিকের ভয়াবহতার কথা জানা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামের বেশির ভাগ নলকূপের পানিতেই আর্সেনিক রয়েছে। কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে কিছু নলকূপ স্থাপন করা হলেও বর্তমানে সেগুলোর বেশির ভাগই অকেজো হয়ে আছে। নতুন করে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কিংবা পর্যাপ্ত নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়নি।
গোপীনাথপুর গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি টিউবওয়েলেই আর্সেনিক। একটা মানুষও ভালো থাকছে না।’ এক বৃদ্ধা বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সাতজন আর্সেনিকে মারা গেছে।’ আরেক বৃদ্ধার দাবি, তার দুই দেবরসহ পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে আর্সেনিকের কারণে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা ৩০ বছর ধরে এসব নলকূপের পানি পান করছেন। পানিতে আর্সেনিক থাকার বিষয়টি জানলেও বিকল্প ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়েই এই পানি পান করছেন এবং বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন।
আর্সেনিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির দাবি, চুয়াডাঙ্গার প্রায় ৫০ শতাংশ গ্রামের নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। জেলার সব উপজেলাতেই আর্সেনিকযুক্ত পানির অস্তিত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রত্যেক উপজেলাতেই আর্সেনিক আক্রান্ত পানি রয়েছে। আমরা সীমিত পরিসরে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করেছি। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশী-বিদেশী দাতা সংস্থাকেও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে। পানির কোনো বিকল্প নেই।’
এ দিকে আর্সেনিক শনাক্তে নলকূপ পরীক্ষার কার্যক্রমও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফলে কোন নলকূপের পানি নিরাপদ আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ, তা জানতে পারছেন না স্থানীয়রা। বেসরকারি উদ্যোগে কয়েকটি গ্রামে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা: হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, কয়েক বছর আগেও গ্রামে বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে রোগী শনাক্ত, প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হতো। এ ধরনের প্রকল্প আবার চালু করা গেলে মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে। তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন এবং দু-এক দিনের মধ্যে ওই গ্রামগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
একদিকে মাঠপর্যায়ে আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের উপস্থিতি ও মৃত্যুর কারণ, অন্য দিকে স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে রোগীর সংখ্যা শূন্য- এই বিপরীতমুখী তথ্যই চুয়াডাঙ্গার আর্সেনিক পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।



