ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দ্রুত বিচার, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিজেআর-২, ২০২৬)। গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইনজীবী, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক ও ছাত্রপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।
‘জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর লিগ্যাসি : জবাবদিহি, সংস্কার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড থট (আরআইটি), ইয়ুথ ফর বেটার ফিউচার সোসাইটি, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজিনা, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সোস্যাল সায়েন্সেস।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবে শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর প্রধান প্রত্যাশা ন্যায়বিচার। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে হতাশা প্রকাশ করে তিনি দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং জুলাইয়ের চেতনার আলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, জনগণের অধিকার ও নৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাই কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়, এটি সমগ্র জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, নানা সঙ্কটের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের সক্ষমতায় দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাই জনগণের শক্তির ওপর আস্থা রেখে জাতীয় পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে অনলাইনে বক্তব্য দেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের সিরিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি হুমা খান এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ। হুমা খান বলেন, জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে শান্তিপূর্ণভাবেও পরিবর্তন সম্ভব। তবে সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। অন্য দিকে জন ড্যানিলোভিচ জুলাই-আগস্টের শহীদ ও আহতদের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার পক্ষে ভূমিকা এবং জুলাই বিপ্লবে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হুমা খানকে ‘ফ্রেন্ডস অব জুলাই রেভল্যুশন’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।
সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো: শরীফুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম এবং ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. মো: ইলিয়াস মোল্লা। বক্তারা আইনের শাসন, বিচার ও জবাবদিহি, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো: সাইদুল ইসলাম, বুয়েটের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, কাতারের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. উসামা আল-আযমী এবং বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়ান ফখরুল। তাদের গবেষণায় জুলাই বিপ্লবকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আরআইটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি বলেন, জুলাইকে ঘিরে আবেগের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠ ও বহুমাত্রিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং সেই গবেষণার ফলাফল রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জননীতি প্রণয়নে কাজে লাগাতে হবে।
ছাত্রপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মো: আবু সাদিক কায়েম বলেন, জুলাইকে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের জাতীয় সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার নতুন যাত্রার সূচনা।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য ও সম্মেলনের সহ-আয়োজক মো: মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ বলেন, জুলাই তাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় অর্জন। ইতিহাস বিকৃতির যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
দিনব্যাপী সম্মেলনের ১৫ প্যানেলে ৮০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাপত্রে জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যম, আইন, বিচার, সংবিধান, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। প্যানেল আলোচনায় জুলাই বিপ্লবের একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্কাইভ নির্মাণ, শহীদ পরিবার ও আহতদের সাক্ষ্য সংরক্ষণ এবং বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামোর কার্যকর সংস্কারের সুপারিশ করা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে আরআইটির নির্বাহী পরিচালক ড. একরাম উদ্দীন দেশী-বিদেশী অতিথি, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।



