৭ জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে ২,৫৪৯ গ্রাহকের দাবি পরিশোধ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জীবন বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এর অংশ হিসেবে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে দুই হাজার ৫৪৯ জন পলিসিধারীর ১৪ কোটি ৫১ লাখ তির হাজার ১৪৬ টাকা ৫৮ পয়সার বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বায়রা লাইফ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর দিলকুশায় আইডিআরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পলিসিধারীদের মধ্যে বীমা দাবির চেক হস্তান্তর করা হয়। আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন গ্রাহকদের হাতে এসব চেক তুলে দেন।

আইডিআর এর তথ্য অনুযায়ী, সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির মোট ৯৪টি চেকের মাধ্যমে দুই হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বীমা দাবি পরিশোধে জটিলতা ও বিলম্বের কারণে এসব কোম্পানির অনেক পলিসিধারী অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তায় ছিলেন। বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর সম্পদ ব্যবহার করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পলিসিধারীরা। কোম্পানিটির এক হাজার ৩৫০ জন গ্রাহককে ছয় কোটি ৯০ লাখ ৩২ হাজার ১৬৫ টাকা ৫৮ পয়সা দেয়া হয়েছে। এরপর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫২৮ জন গ্রাহকের মধ্যে পাঁচ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৯ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৬২৪ জন গ্রাহককে দেয়া হয়েছে এক কোটি ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ টাকা। হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৫ জন গ্রাহক পেয়েছেন ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯১ টাকা। এ ছাড়া সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০ জন গ্রাহককে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ২৬৬ টাকা, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আটজন গ্রাহককে চার লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ টাকা এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চারজন গ্রাহককে দুই লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, পলিসিধারীদের ন্যায্য দাবি সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বীমা খাতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে দাবি নিষ্পত্তির গতি ও স্বচ্ছতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বীমা দাবি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকদের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বাড়বে বলে মনে করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে গড়িমসি ও জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা কিছু জীবন বীমা কোম্পানির পলিসিধারীরা মেয়াদপূর্তি বা বীমা দাবি পাওয়ার পরও অর্থ না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন। এতে বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ অবস্থায় আইডিআরএর বিশেষ উদ্যোগে সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধের কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, পলিসিধারীদের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে বীমা খাতে দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে শুধু এক দফা দাবি পরিশোধের মাধ্যমে এ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হবে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সাথে যেসব কোম্পানি নিয়মিতভাবে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

আইডিআরএর এবারের উদ্যোগে সাতটি কোম্পানির দুই হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি হলেও দেশের জীবন বীমা খাতে বকেয়া দাবির পরিমাণ আরো বেশি। ফলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কোম্পানির পলিসিধারীদের আটকে থাকা দাবিও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে গ্রাহকদের।

বীমা খাতের আস্থা পুনর্গঠনে গ্রাহকের দাবি দ্রুত পরিশোধকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পলিসি করার সময় গ্রাহক যে প্রতিশ্রুত আর্থিক সুবিধার প্রত্যাশা করেন, তা যথাসময়ে না পেলে বীমা ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা নষ্ট হয়। ফলে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে নতুন করে দাবি আটকে না থাকে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইডিআরএর এই বিশেষ উদ্যোগে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ৯৪টি চেকের বিপরীতে মোট ১৪ কোটি ৫১ লাখ ৩ হাজার ১৪৬ টাকা ৫৮ পয়সা পরিশোধের মাধ্যমে হাজার হাজার পলিসিধারীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এখন বাকি গ্রাহকদের দাবিও দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।