পদ্মা ব্যারাজ উঠছে একনেকে : ব্যয় ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

অবশেষে বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের স্থবির প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারাজ’ আবারো জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার তালিকায় দৃশ্যমানভাবে ফিরছে। আগামী একনেক সভায় প্রথম পর্যায়ের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হতে যাওয়া এ প্রকল্পটি কেবল একটি অবকাঠামো উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলরাজনীতি, পরিবেশগত সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত একটি কৌশলগত প্রকল্প।

রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর পরিকল্পিত এই ব্যারাজকে কেন্দ্র করে যে উন্নয়ন কল্পনা তৈরি হয়েছে, তা দেশের পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ কাঠামোকেই বদলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো।

প্রকল্পের মূল কাঠামো : পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- মোট ব্যয় : ৩৩,৪৭৪.৪৫ কোটি টাকা; সময়সীমা (প্রথম পর্যায়) : ২০২৬-২০৩৩; মূল অবকাঠামো: ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ; স্পিলওয়ে : ৭৮টি; আন্ডার স্লুইস : ১৮টি; ফিশ পাস: ২টি; জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র: ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি শুধু পানি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌ চলাচল এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি বহুমাত্রিক অবকাঠামো হবে।

ভূ-অর্থনৈতিক ও কৃষি গুরুত্ব

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দাবি হলো- প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই পানি ব্যবহার করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী- প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে; বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন সম্ভব; প্রায় ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে।

কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কটে ভুগছে। এই প্রকল্প সেই সঙ্কট হ্রাসে একটি বড় কাঠামোগত সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

পরিবেশগত প্রভাব ও পানিরাজনীতি

এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশগত ও আন্তঃসীমান্ত পানিলরাজনৈতিক প্রভাব। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যায়। এর ফলে নদীগুলোতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি; কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস; সুন্দরবন অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি হয় এবং ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব মোকাবিলার কৌশল হিসেবে পদ্মা ব্যারাজকে দেখা হচ্ছে একটি ‘কাউন্টার হাইড্রোলজিক্যাল স্ট্রাকচার’ হিসেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে, যা সুন্দরবনের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

যদিও প্রকল্পটি সম্ভাবনাময়, তবে এর আর্থিক কাঠামো নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। কারো কারো মতে, ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বড় বিনিয়োগ চাপ। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নির্ভরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ভবিষ্যতে বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

সরকার এটিকে ‘কৌশলগত বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখছে, যার বার্ষিক অর্থনৈতিক সুবিধা প্রায় আট হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই হিসাব বাস্তবায়নের কার্যকারিতা, পানি প্রবাহের স্থায়িত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞ মতামতের দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি

পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত এই প্রকল্পকে দীর্ঘদিনের একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এটি নতুন ধারণা নয়; বরং বহু দশকের গবেষণার ধারাবাহিকতা।

অন্য দিকে বুয়েটের পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যারাজ নির্মাণ যথেষ্ট নয়; নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় পানিচুক্তি সমন্বয় না হলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না।

রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট

এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক মাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে এটি বিভিন্ন সরকারের আমলে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি ‘ডেলিভারি প্রকল্প’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একই সাথে এটি নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য এক দিকে সম্ভাবনার প্রতীক, অন্য দিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সূচকও। যদি সঠিক নকশা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জল ও কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে ভুল পরিকল্পনা বা দুর্বল ব্যবস্থাপনা হলে এটি একটি ব্যয়বহুল কিন্তু অকার্যকর অবকাঠামোতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও কম নয়। ফলে এই প্রকল্প এখন শুধু একটি ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা, পরিবেশনীতি এবং উন্নয়ন দর্শনের একটি পরীক্ষাও বটে।