মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানকে আঞ্চলিকভাবে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানকে সফল বলে মনে করেন না।
মিডলইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ানের মতে, নেতানিয়াহু এমন একটি আঞ্চলিক বাস্তবতা দেখতে চান যেখানে ইসরাইল হবে প্রধান প্রভাবশালী শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজা, পশ্চিমতীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানকে ঘিরে যে অস্থিরতা ও সঙ্ঘাত চলছে, সেগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের অংশ। লেখকের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইসরাইল তার কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু এটিকে কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বরং আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দেশের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী বিদেশী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে জনসমর্থন কমে এসেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট-উভয় দলের অনেক ভোটারই বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মার্কিন জনগণকে অন্য দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থরক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য দিতে হবে। তাদের বক্তব্যের সাথে অনেক সাধারণ আমেরিকানও একমত হচ্ছেন। তারা মনে করেন, বিদেশি সঙ্ঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো নতুন বৃহৎ সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ে, তাহলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতি বেশ সংবেদনশীল। নিবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
লেখক আরো উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর ফলে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সাথে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এসব বাস্তবতা ওয়াশিংটনকে বুঝতে বাধ্য করছে যে শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সবসময় সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে সঙ্ঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে বাধ্য হয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। তবে সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একইভাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে পারেনি কিংবা অঞ্চল থেকে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। ফলে উভয়পক্ষ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই নিজেদের কাক্সিক্ষত পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজস্ব নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। কোনো যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা যদি ইরানকে ধ্বংস না করেই সঙ্ঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়, তাহলে সেটিকে অনেকেই তেহরানের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখবে। আর ঠিক এই কারণেই এমন সমঝোতা নেতানিয়াহুর কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে ।



