- চীনা অর্থায়নে ১৬ হাজার ১১০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
- ডাবল লাইনের দাবি সিলেটবাসীর
দীর্ঘ এক দশকের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প। প্রায় ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি চীনের সরকারি অর্থায়নে (জিটুজি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাব (পিডিপিপি) অনুমোদন করা হয়েছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি নতুন করে জোরালো হয়েছে আরেকটি দাবি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, রেল কর্মকর্তাদের একটি অংশ এবং সিলেটবাসীর মতে, শুধু ডুয়েলগেজ নয়, একই সাথে ডাবল লাইন নির্মাণ করা না হলে কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না। ডাবল লাইন হলে ট্রেনের সংখ্যা ও ফ্রিকোয়েন্সি বাড়বে, গতি বৃদ্ধি পাবে এবং সিলেট-ঢাকা যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
প্রকল্পটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৬ সালে। শুরু থেকেই অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় চীন। পরে ভারতও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইরকন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করলে অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। দুই দেশের প্রতিযোগিতা ও অর্থায়ন অনিশ্চয়তায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকে প্রকল্পটি বাদ দেয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীন পুনরায় ঋণ দিতে সম্মত হওয়ায় প্রকল্পটি নতুন করে গতি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে চীন সরকারের অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। একই সাথে চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে দর-কষাকষির (নেগোসিয়েশন) সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন রয়েছে। নতুন রেলপথে ট্রেনের নকশাগত গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার ধরা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা (প্রায় ১২৭ কোটি মার্কিন ডলার) ঋণ চাওয়া হয়েছে চীনের কাছ থেকে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি।
বর্তমানে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত করার কাজ চলছে, যা ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ। কিন্তু আখাউড়া-সিলেট অংশ এখনো মিটারগেজ হওয়ায় পুরো রুটের সক্ষমতা সীমিত। এ কারণে আখাউড়া-সিলেট অংশকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করা জরুরি বলে মনে করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) শেখ সাকিল উদ্দিন আহমদ বলেন, অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এডিপি থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। তবে চীন থেকে অর্থায়নের নিশ্চয়তা মিলেছে। ফলে পুনরায় প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, চলতি বছরের জুন মাসে চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়, এর আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের ঋণ গ্রহণে আগ্রহী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ঋণ দেয়ার বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রস্তাব করা হয়। এ অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করতে কাজ করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানা যায়, সব মিলিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় সমজাতীয় চারটি প্রকল্পের তুলনায় প্রায় সাতগুণ। এত ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সমীচীন হবে না বলে মনে করছিল কমিশন। প্রস্তাবিত প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। কমিশনের মতে, চীনের অন্য দরদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্যও দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতে হবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ওই প্রকল্পে অনেক বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বাতিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছিল।
পরিকল্পনা কমিশন আরো বলেছিল, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডুয়েলগেজ লাইন হলে ট্রেন চলাচলের হার (ফ্রিকোয়েন্সি) বাড়বে না। সরকারের এ বিশাল বিনিয়োগে জনগণের তেমন কোনো সুবিধা হবে না।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এ প্রকল্পে আপত্তি তুলে এক চিঠিতে বলেছিলেন, এটা ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হওয়া উচিত। শুধু ডুয়েলগেজ করে কোনো লাভ হবে না। পরে ২০১৯ সালের এপ্রিলে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) মামুনুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি চীনা অর্থায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে হচ্ছিল। কিন্তু মাঝখানে নানা কারণে এটা হয়নি। তবে আশার আলো হচ্ছে প্রকল্পটি অবশেষে চীনা অর্থায়নেই হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
বর্তমানে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরনো সেতু, মেয়াদোত্তীর্ণ অবকাঠামো এবং পুরনো ইঞ্জিন ও কোচের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে অন্তত ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে, যেগুলোতে ট্রেনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। আগে যেখানে ঘণ্টায় ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলত, বর্তমানে অনেক অংশে গতি নেমে এসেছে প্রায় ৪০ কিলোমিটারে।
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেসে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াত করেন।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শুধু রেলপথের নিরাপত্তা ও গতি বাড়বে না, সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন, বাণিজ্য এবং আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগেও নতুন গতি সঞ্চার হবে। তবে সেই সুফল পূর্ণমাত্রায় পেতে হলে ডুয়েলগেজের পাশাপাশি ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



