দূরত্ব বাড়ছে হেফাজত-সরকারের

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

ক্রমেই দূরত্ব বাড়ছে হেফাজতে ইসলাম ও সরকারের মধ্যে। বিশেষ করে বিভিন্ন ইসলামি ইস্যু ঘিরে এ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বর্তমানে হেফাজতের মধ্যে একটা গুমট ভাব দেখা গেলেও ধীরে ধীরে এটি বিস্ফোরিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত জাতীয় নির্বাচনের আগে হেফাজতে ইসলামে থাকা রাজনৈতিক দলের নেতারা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে বিএনপির পক্ষ নেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। অন্য দিকে মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতের সাথে জোট করে। তবে হেফাজত আমির বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। সেখানে সংগঠনটির আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীসহ অন্য শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় হেফাজতকে আগের মতো বিএনপির সাথে থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। অন্য দিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে সরকার প্রধানের কাছে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান হেফাজত নেতারা। বিএনপি ও হেফাজতের পক্ষ থেকে এ বৈঠককে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সরকারের ছয় মাস না যেতেই সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে হেফাজতে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে লিংকনকে নিয়োগে বিরোধিতা

সম্প্রতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে সরকারের অবস্থানের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে হেফাজত। ওলামা-মাশায়েখ ব্যানারে হেফাজত নেতারা গাইবান্ধা-৪ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ না দেয়ার আহ্বান জানায়। তবে হেফাজতের এ অবস্থানকে বিবেচনায় না নিয়ে সরকার শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করেছে। এরপর হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মুফতি কিফায়াতুল্লাহ আজহারীর বরাত দিয়ে পাঠানো বিবৃতিতে শামীম কায়সার লিংকনকে ‘দেশের প্রচলিত পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত চার মাজহাবের চেতনা-বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী’ উল্লেখ করে তাকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করায় তীব্র প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সাথে সরকারকে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। তবে সরকার তাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় এ ঘটনায় চরম হতাশ হয়েছে হেফাজত।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন

সদ্য শেষ হওয়া জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকার ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পাস করেছে। সংসদে থাকা বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এ বিলের বিরোধিতা করেছে। সংসদের বাইরে থেকে হেফাজতে ইসলামও এ বিলের বিরোধিতা করেছে। যাদের ছেলে সন্তান নেই, এমন পরিবারের বাবা-মা জীবিত থাকতেই মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং একই সাথে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। এমন সুযোগ রেখেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে এ বিল। জামায়াত ও হেফাজত এ বিলকে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী উল্লেখ করে এ বিল বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিলটি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। জামায়াত ও হেফাজত এখনো সরকারকে এ বিল প্রত্যাহারের আহ্বান অব্যাহত রেখেছে। তবে সরকার তাদের অবস্থানে এখনো অনড় রয়েছে।

এ নিয়ে গত রোববার জরুরি বৈঠক করেছে হেফাজত। আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে হেফাজত নেতৃবৃন্দসহ ইসলামী ফিকাহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বৈঠকে হেফাজত নেতারা ইসলামী শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে, তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এই আইন কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলিম প্রধান এদেশে ইসলামী শরিয়াহ বিরোধী কোনো আইন গ্রহণযোগ্য হবে না। এই বিল সংশোধন করতে হবে। সরকারের উচিত ছিল বিলটি সংসদে উত্থাপন করার আগে ইসলামী শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা। আল্লাহর কিতাব কুরআনের নিজস্ব আইনি কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের মতো করে আইন বানানো শরিয়াহকে অবজ্ঞা করার শামিল বলেও হেফাজত নেতারা মনে করেন।

প্রাণ আরএফএলকে পাটকল ইজারা

সরকার সম্প্রতি খুলনা ও সিরাজগঞ্জে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ঘটনায় আলেমরা ক্ষুব্ধ হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওস্থ জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলূম কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় সংগঠনের মহাসচিব ও হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী তার বক্তব্যে খুলনা ও সিরাজগঞ্জে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রাণ-আরএফএল কাদিয়ানি কোম্পানি। খতমে নবুওয়ত আকিদা বিশ্বাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে কাদিয়ানি কোম্পানিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া আমাদের ঈমানের ওপর চরম আঘাতের শামিল। তিনি এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানান। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী না করার আবেদন শোনেনি। অন্য দিকে সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী বিল পাস করেছে। আলেমরা সরকারকে আবারো শীর্ষ আলেমদের সাথে বসার পরামর্শ দিয়েছে। আশা করি ওই বৈঠকে সমস্যার সমাধান হবে। এ আইন প্রত্যাহারের এখনো সময় আছে। তিনি বলেন, হেফাজত সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে। ইসলামের আকিদা ও মূলনীতি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। সরকার যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে ইসলামের মূলনীতির বাইরে চলে যায় তাহলে হেফাজতও তাদের অবস্থান থেকে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে।