সাইফুল ইসলাম নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা)
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বীরত্বগাথা ইতিহাস স্মরণে থাকলেও, বাস্তবতার কষাঘাতে ধুঁকছেন ফেনী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আনোয়ারুল আজিম (২০)। গত জুলাই-২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফেনীর মহিপালে সশস্ত্র ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। গুলিতে তার বাম পায়ের গোড়ালি ও হাড় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তবে দেশমুক্তির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত ও সঠিক চিকিৎসার অভাবে চিরতরে পা হারাতে বসেছেন এই তরুণ জুলাই যোদ্ধা।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার নারায়নকোট গ্রামের দরিদ্র কৃষক আবদুল হাইয়ের একমাত্র ছেলে আজিম। আন্দোলনে অংশ নিয়ে তার হাড় ও লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ দুই বছর ধরে পায়ের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করছেন তিনি। ডিপ্লোমা পাস করেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে চাকরি বা কোনো কাজ করতে পারছেন না। আজিম আক্ষেপ করে বলেন, কোনো কিছুর প্রত্যাশায় রক্ত দিতে যাইনি। কিন্তু আজ সঠিক চিকিৎসার অভাবে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জোহরের নামাজরত আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা ও গুলি চালায় সশস্ত্র ক্যাডাররা। সেদিন সহপাঠীদের বাঁচাতে গিয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন আজিম। প্রথমে ফেনী সদর ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহায়তায় তাকে ঢাকার তৎকালীন পিজি (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৩ মাস চিকিৎসাধীন থাকলেও কোনো উন্নতি না হওয়ায় মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে অন্যরকম হয়রানির শিকার হতে হয় আজিমকে। সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত খরচের অজুহাত দেখিয়ে তার চিকিৎসা সংক্ষিপ্ত করেন। চিকিৎসকরা তাকে অস্ত্রোপচার পরবর্তী ১২ সপ্তাহের ফিজিওথেরাপি দেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেও, মাত্র দুই সপ্তাহের থেরাপি শেষে আজিমকে না জানিয়েই প্লেনের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হয়। শুধু তা-ই নয়, চিকিৎসা খরচের বরাদ্দের ২০ হাজার টাকা উত্তোলনের জন্য ভাউচার জমা দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজো সেই টাকা পাননি তিনি।
বর্তমানে আজিমের বাম পা ধীরে ধীরে শুকিয়ে ও অকেজো হয়ে যাচ্ছে। বিছানায় শুতে বা বসতে চরম যন্ত্রণা হয়। সিঙ্গাপুরে ফলোআপ চিকিৎসার বিষয়ে ‘শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এ যোগাযোগ করা হলে বাজেট নেই জানিয়ে ব্যক্তিগত খরচে চিকিৎসা করার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু দরিদ্র কৃষক বাবার পক্ষে ছেলের কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অসম্ভব।
বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা এই তরুণ এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। একমাত্র ছেলের কর্মক্ষমতা ফিরে পাওয়া ও উন্নত সুচিকিৎসার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও পুনর্বাসনের আকুল আবেদন জানিয়েছেন আজিমের পরিবার। আজিম বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের জন্য পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি চাই। আমার পরিবারকে যেন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।



