রেজাউল হক রামগতি (লক্ষ্মীপুর)
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের মেঘনা তীরবর্তী দুর্গম বয়ারচরে কয়েকটি দস্যুবাহিনীর তৎপরতায় স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘ভোল পাল্টিয়ে’ কয়েকটি ডাকাত বাহিনী ও দস্যু গ্রুপ চরটিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। দস্যুবাহিনীর একের পর এক চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন। সর্বশেষ দস্যুবাহিনীর দাবিকৃত চাঁদা দিতে না পারায় হামলার ভয়ে মাইনউদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাকার বাইরে অবস্থান করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এই দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর তৎপরতা চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী চরগাজী ইউনিয়নের দক্ষিণ টুমচর (বয়ারচর) এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় ব্রিজঘাট বাজারের গোস্ত ব্যবসায়ী মো: মাইন উদ্দিন জানান, প্রায় দুই মাস আগে স্থানীয় একটি চা দোকানের সামনে থেকে তার ছোট ছেলে মো: ফয়সালকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ‘ফরিদ বাহিনীর’ সেকেন্ড ইন কমান্ডার বাদশা ডাকাতের সহযোগী ওয়ারেছ। পরে তার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করলে তিনি নিজের একটি গরু ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে দুই লাখ টাকা বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাতের হাতে দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন।
এ দিকে গত রোববার সকালে বাদশা, ওয়ারেছ, মহিন ও মনিরসহ আরো কয়েকজন তার বাড়িতে হানা দেয়। এ সময় তারা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করার পর চাঁদা হিসেবে একটি গরু দাবি করেন। দাবিকৃত গরু না দিলে তার স্ত্রী ও ঘরে থাকা পুত্রবধূকে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাইন উদ্দিন বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে আছেন।
মাইন উদ্দিনের আরেক ছেলে মো: মামুন বলেন, এক সাপ্তাহ ধরে আমরা এলাকা ছাড়া। আমি ব্রিজঘাট এলাকায় গোশত বিক্রির ব্যবসা করি। ওয়ারেছ ও বাদশা ডাকাতের অত্যাচারে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছি না। প্রতিটি গরু থেকে তাদের একটি নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়।
জানা গেছে, বয়ারচর এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম। এলাকাটি বিভিন্ন ডাকাত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ব্রিজঘাট, তেগাছিয়া ও টাংকিরঘাট এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, লুটপাট, অগ্নিসংযাগ ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, জমি দখল, বসতবাড়ি ও পুলিশ ফাঁড়ি দখলসহ কয়েকটি ডাকাত বাহিনী বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছে। এর মধ্যে ফরিদ বাহিনীর আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। তার বাহিনীতে বাদশাহ, ওয়ারেছ, ভুট্টু, ফজলু, আলমগীর, হোসেন, আওলাদ, আইয়ুব আলী, কবির ও মাকছুদসহ অর্ধশতাধিক সদস্য রয়েছে। এসব ডাকাত সদস্যরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বয়ারচরের ব্রিজঘাট, দক্ষিণ টুমচর, নুরুল্লার সমাজ, তেগাছিয়া ও টাংকিরঘাট এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাত এক সময়ে নোয়াখালীর হাতিয়ার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে ভোল পাল্টিয়ে সে বিএনপির নাম ভাঙিয় আগের চেয়েও বেশি তৎপরতা চালাচ্ছেন। তার এসব অপকর্ম নিয়ে জহির উদ্দীন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা রামগতি থানা ও সেনা ক্যাম্পে পৃথক দু’টি অভিযোগও করেন। এ ছাড়া এসব ডাকাতের বিরুদ্ধে রামগতি, হাতিয়া ও ভোলার বিভিন্ন থানায় আরো কয়েক ডজন মামলা থাকলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অন্তত ১৫টি মামলায় এই ডাকাতদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে।
এসব বিষয় জানতে চাইলে অভিযুক্ত ওয়ারেছ ডাকাত তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এসব কাজের সাথে জড়িত নন। ফরিদ বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাতের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করননি।
রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান বলেন, বয়ারচর এলাকাটি খুবই দুর্গম। যে কারণে, অপরাধীরা নানা ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চরটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, চাঁদা দিতে না পারায় ব্যবসায়ীর পরিবার এলাকা ছাড়ার বিষয়টি তাকে কেউ জানায়নি। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো: আবু তারেক বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ওসিকে নির্দশ দেয়া হবে।



