শাহেদ মতিউর রহমান
শিক্ষার মানে ঘাটতি আর আস্থার অভাবে দেশের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই প্রায় অর্ধেকে নেমেছে বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। করোনা মহামারীতেও যেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীর বাংলাদেশে আসা এবং ভর্তিতে খুব বেশি নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করেনি। কিন্তু গত তিন বছরের পরিসংখ্যান যে তথ্য দিচ্ছে তা আমাদের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর জন্য রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। করোনা মহামারী শুরু পর ২০১৯ সাল থেকেই একটানা তিন বছর অর্থাৎ ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থী, ভর্তি সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ২০২১ সালের পর দেশে ক্রমাগতই বিদেশী শিক্ষার্থী কমে। অর্ধেকে নেমে ঠেকেছে।
বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানায়, বিগত দশ বছরের মধ্যে দেশে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ২০১৭ সালে। ওই বছর দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৯৭৭ জন। পরপর ২০১৮ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৩৮৬ জন। সূত্র আরো জানায়, ২০২১ সালে বিদেশী শিক্ষার্থী ছিল ১৬০৪ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কমে হয় মাত্র ৮২৬ জনে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক সময় দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে তাদের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছে, বিদেশী শিক্ষার্থী আকর্ষণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারেনি। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব ও আবাসন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিদেশী শিক্ষার্থীরা মালয়েশিয়া, চীন, ভারত ও তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে ঝুঁকছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি প্রক্রিয়া এখনো জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ভিসা প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক প্রচারণার দুর্বলতাও বড় বাধা। ইউজিসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ ভর্তি প্রক্রিয়া, ভাষাগত সমস্যা এবং পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব বিদেশী শিক্ষার্থী কমার অন্যতম কারণ।
অন্য দিকে দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ায় বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। গবেষণা প্রকাশনা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশী শিক্ষার্থী বাড়াতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদেশে পরিকল্পিত প্রচারণা চালাতে হবে। একই সাথে ভিসা ও ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশী শিক্ষার্থী শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগই সৃষ্টি করে না, বরং একটি দেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই এই খাতে ক্রমহ্রাসমান আগ্রহ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দেশে বিদেশী শিক্ষার্থী কমার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আবাসন, ক্যাম্পাস জীবন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থার ঘাটতি। ইউজিসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান মনে করেন, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্যই পর্যাপ্ত আবাসন ও গ্রন্থাগার সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। সেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ গড়ে তোলা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বিদেশী শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আন্তর্জাতিক বিপণন কৌশল নেই বললেই চলে। অন্য দিকে দেশের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা, গবেষণায় কম বিনিয়োগ এবং শিক্ষা মান নিয়ে সমালোচনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।



