অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য আদৌ কোনো প্রণোদনা থাকছে কি না, থাকলে তা কেমন হতে পারে, এটিই ছিল গতকাল দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। অতীতে সংসদে বাজেট প্রস্তাবের আগেই এ-সংক্রান্ত কিছু কিছু বিষয় জানা গেলেও এবার এ নিয়ে অনেকটা তিমিরেই আছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে গতকাল পুঁজিবাজারের দিনটি একধরনের সংশয়ের মধ্য দিয়েই পার হয়েছে। আর এর প্রতিফলন ঘটে বাজার আচরণে। ঢাকা শেয়ারবাজারে ছিল সূচকের মিশ্র আচরণ, অন্য দিকে চট্টগ্রামে অবনতির শিকার হয় সব সূচক। হ্রাস পেয়েছে ঢাকা বাজারের লেনদেনও।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বরাবরই বাজেট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে একধরনের আবেগ কাজ করে। কারণ বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকা বিনিয়োগকারীরা বছরের এ সময়টিতে তাকিয়ে থাকেন বাজেটের দিকে। এ সময়টিতে পুঁজিবাজার ভালো কোনো প্রণোদনা পেলে তা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান কমাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে। এবার কোনো আবাস না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে একপ্রকার সংশয় কাজ করছে। আর এতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৫১৯ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৫১৬ দশমিক ৮২ পয়েন্টে। সকালে লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টার মাথায় সূচকটি ৪০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটলেও পরে বিক্রয়চাপের পড়ে। প্রথম দিকে এ চাপ বাজারগুলো সামলে নিলেও দুপুর সাড়ে ১২টার পর তা আবার তীব্র আকার ধারণ করে, যা দিনশেষে প্রধান দু’টি সূচকের সামান্য পতন ঘটায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ০ দশমিক ০৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হলেও ডিএসই শরিয়াহ নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) তিনটি সূচকেরই পতন ঘটে। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৭৩ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট হারায়। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৯২ ও ৪৪ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট।
সূচকের মিশ্র আচরণ ডিএসইর লেনদেনকেও কিছুটা প্রভাবিত করে। বাজারটি গতকাল এক হাজার ২১০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১৭৭ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। তবে লেনদেন সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ২৩ কোটি থেকে ২৪ কোটি টাকায় পৌঁছে লেনদেন।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়কর আইনের সংশোধনীতে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ আসতে পারে। আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। তবে জানা গেছে ব্যাংক, বীমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এ নতুন কর ব্যবস্থার বাইরে রাখা হচ্ছে।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড বিতরণের এই নীতি কার্যকর হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ নীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা সংরক্ষণ করে তুলনামূলক কম ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়া কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারবান্ধব অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণার প্রবণতাও কমে আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি কর-পরবর্তী নিট আয়ের ৩০ শতাংশের কম ডিভিডেন্ড বিতরণ করে, তাহলে নির্ধারিত ৩০ শতাংশের সুনির্দিষ্ট এই সীমা এবং প্রকৃত বিতরণকৃত লভ্যাংশের মধ্যে যে ঘাটতি থাকবে, সেই অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে কর পরিশোধ না করলে উপকর কমিশনার নোটিশ জারি করে শুনানির সুযোগ দেয়ার পর কর নির্ধারণ করতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, তাহলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড বিতরণ করতে হবে। কিন্তু কোম্পানিটি যদি মাত্র ২০ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড দেয়, তাহলে অবশিষ্ট ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
বর্তমানে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি আগের বছরের কর-পরিশোধিত নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি অর্থ সংরক্ষিত আয়, তহবিল, সঞ্চিতি বা উদ্বৃত্ত হিসেবে স্থানান্তর করলে ওই স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়; অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থায় মুনাফা সংরক্ষণের পরিমাণ করের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। নতুন প্রস্তাবে সেই কাঠামো পরিবর্তন করে ডিভিডেন্ড বিতরণের হারকে কর আরোপের মূল ভিত্তি করা হচ্ছে।
অন্য দিকে স্টক ডিভিডেন্ড-সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হলে অথবা শুধু স্টক ডিভিডেন্ড বিতরণ করা হলে স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক, বীমা, লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে এ কর থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। তবে অন্যান্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর বহাল থাকবে।



