২ লাখ কোটি টাকা লুটে নেয়া এস আলমের পাপের ঘানি টানছেন ব্যাংকাররা

দুদক ও আদালতের বারান্দায় ৬০০ ব্যাংক কর্মকর্তা

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত কেলেঙ্কারিগুলোর একটি এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কৌশলে গ্রুপটি দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়েছে, যার বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে। কিন্তু এ কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত এস আলম ও তার সুবিধাভোগীরা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাদের ঋণ অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে দায়িত্ব পালন করা শত শত ব্যাংক কর্মকর্তা এখন দুদক, আদালত ও তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার ভার বহন করছেন। ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে এমন কর্মকর্তার সংখ্যা ছয় শতাধিক।

বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকসহ ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। এসব ঋণের বেশির ভাগই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা উপো করে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অনেক েেত্র একই গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ, দুর্বল জামানত, ভুয়া আমদানি, বেনামি কোম্পানি এবং ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বের করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর সরাসরি সুবিধাভোগী ছিলেন এস আলম, তার অন্যতম সহযোগী আকিজ উদ্দিন, মিফতা উদ্দিন, জেকিউএম হাবিবুল্লাহ, ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক এমডি মোকাম্মেল হকসহ কয়েকজন ডিএমডি। যাদের বেশির ভাগই ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। বিদেশে বসে তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।

এই ঋণ অনুমোদনের নথিতে স্বার করেছিলেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের ঋণ বিভাগের কর্মকর্তা, করপোরেট শাখা ব্যবস্থাপক, ট্রেড ফাইন্যান্স কর্মকর্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ঋণ কমিটির সদস্যরা। বর্তমানে তাদের অনেকেই তদন্তাধীন, কেউ মামলার আসামি, আবার কেউ নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন, কেউ বা জেলে রয়েছেন।

ব্যাংকিং খাতের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিতর্কিত অনেক ঋণ অনুমোদনের সময় কর্মকর্তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল। অনেকেই বোর্ড বা মালিকপরে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেননি। কেউ আপত্তি তুললে বদলি, পদাবনতি কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতো। ফলে চাকরি রার্থে অনেক কর্মকর্তা নথিতে স্বার করতে বাধ্য হন। একজন সাবেক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে এসব ঋণের বিপে ছিলেন। কিন্তু বোর্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আজ সেই কর্মকর্তাদেরই আদালতে গিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হচ্ছে।’ তবে তদন্তকারীরা বলছেন, সব কর্মকর্তাকে একইভাবে দেখা হচ্ছে না। যাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, যোগসাজশ বা জালিয়াতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে, তাদের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলা, অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ মিলিয়ে ছয় শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা কোনো না কোনোভাবে তদন্তের আওতায় রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে। এ ছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আভিভা ফাইন্যান্স এবং আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও তদন্তের মুখোমুখি। এসব কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমান ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসইভিপি, ইভিপি, শাখা ব্যবস্থাপক, করপোরেট ব্যাংকিং কর্মকর্তা, ট্রেড ফাইন্যান্স কর্মকর্তা, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য এবং কোম্পানি সচিবও রয়েছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, এস আলম গ্রুপের সহযোগী ও বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ধারাবাহিকভাবে ঋণ অনুমোদন করা হয়। অনেক েেত্র একই গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানকে পৃথক গ্রাহক হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা এড়িয়ে যাওয়া হয়। আবার কোথাও দুর্বল বা অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া হয়। এ ছাড়া ভুয়া আমদানি, ওভার-ইনভয়েসিং, কাল্পনিক যন্ত্রপাতি আমদানি, কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ এবং পুনঃতফসিলের অপব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে এসেছে। এসব পদ্ধতিতে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে এসব কর্মকর্তার অনেককে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। কেউ জামিন নিয়েছেন, কেউ তদন্ত কর্মকর্তার সামনে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিচ্ছেন। একজন এমডিসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা জেলে রয়েছেন। অনেকের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আবার চাকরিতে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও চলছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের আর্থিক ও মানসিক চাপ বেড়েছে। অনেকেই অবসরে গেলেও মামলা থেকে মুক্তি পাননি।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কেলেঙ্কারি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়; এটি করপোরেট গভর্ন্যান্স, ব্যাংক পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির বড় ধরনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। তাদের মতে, তদন্তে প্রকৃত দায় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যারা পরিকল্পিতভাবে জালিয়াতিতে অংশ নিয়েছেন- এই দুই শ্রেণীর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা প্রয়োজন। অন্যথায় নিরীহ কর্মকর্তারা অযথা হয়রানির শিকার হতে পারেন, আবার প্রকৃত অপরাধীরাও দায় এড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানে প্রমাণ থাকবে যে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন বা জালিয়াতিতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন, সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কিন্তু শুধুমাত্র ঊর্ধ্বতন নির্দেশ বাস্তবায়নের কারণে স্বার করা কর্মকর্তাদের েেত্রও তদন্তে বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি এবং বিদেশী আদালতের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে গেলে রাষ্ট্রের আর্থিক তি পূরণ হবে না; বরং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- যখন শত শত কর্মকর্তা আদালত ও দুদকের বারান্দায় ঘুরছেন, তখন এই বিপুল অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ, অর্থ উদ্ধার এবং বিচারপ্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে এগোচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এস আলম গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির বিচার তখনই অর্থবহ হবে, যখন শুধু নথিতে স্বারকারী কর্মকর্তাদের নয়, বরং পরিকল্পনাকারী, সুবিধাভোগী এবং অর্থ পাচারের সাথে জড়িত মূল ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় এনে রাষ্ট্রের তিগ্রস্ত অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবেই দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধে কার্যকর বার্তা যাবে।