২১ বছর পর অসিদের হারাল বাংলাদেশ

Printed Edition
৫০ বলে ৩৫ রান করা কুপার কুনলিকে আউটের পর বাংলাদেশ খেলোয়াড়দের উল্লাস
৫০ বলে ৩৫ রান করা কুপার কুনলিকে আউটের পর বাংলাদেশ খেলোয়াড়দের উল্লাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক

মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ডিএল মেথডে ৮৬ রানে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। জয়টা অনুমিতই ছিল। জিততে হলে দরকার ছিল মাত্র ১ উইকেটের। বেরসিক বৃষ্টি ও হঠাৎ বজ্রপাত শুধু সময় ক্ষেপণ করল। নিয়ম অনুযায়ী বজ্র্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানি হলে আধাঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে। সে হিসাবে কয়েকবার বিদ্যুৎ চমকালে ৭.০৫ থেকে ৮.০৪ মিনিট পর্যন্ত খেলা বন্ধ থাকে। এরপর ডিএল মেথডে বাংলাদেশকে ৮৬ রানে জয়ী ঘোষণা করা হয়।

২০০৫ সাল। কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম হারানোর গল্প। এরপর আর কখনো অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। সেটিই ছিল প্রথম এবং একমাত্র জয়। এরপর কেটে গেছে ২১টি বছর। অবশেষে ঘুচল দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে দ্বিতীয়বারের মতো হারাল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যেমন দাপটে খেলেছে, জয়টা প্রাপ্যই ছিল। বড় ব্যবধানের এই জয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। আগামীকাল বেলা ১১টায় একই ভেনুতে হবে দ্বিতীয় ওয়ানডে। ২৮৬ রান তাড়া করতে নেমে ৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রান তুলেছে অজিরা। ৪৬ বলে আরো ৯৪ রান দরকার ছিল অস্ট্রেলিয়ার। ক্যামেরন গ্রিন ফিফটি করে একটা প্রান্ত ধরে রাখলেও জয় পাওয়া বলতে গেলে অসম্ভব ছিল সফরকারীদের। বৃষ্টিও তাদের হার আটকে রাখতে পারেনি।

মিরপুরে ২৮৬ রান ডিফেন্ড করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু পায় বাংলাদেশ। ইনিংসের প্রথম বলেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ম্যাথু শর্টের উইকেট উপড়ে ফেলেন তাসকিন আহমেদ। ফলে রানের খাতায় কিছু যোগ হওয়ার আগেই উইকেট হারায় অজিরা। পরের ওভারে আরো এক উইকেট। এবার মোস্তাফিজুর রহমানের বলে এলবিডব্লিউ মার্নাস লাবুশেন (১)। আম্পায়ার শুরুতে আউট দেননি। পরে রিভিউ নিয়ে জেতে বাংলাদেশ। ফলে ২ রানে ২ উইকে হারায় সফরকারীরা। এরপর অনেকটাই সেট হয়ে গিয়েছিলেন জশ ইংলিশ। নাহিদ রানার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে পরাস্ত হন তিনি। রানার গতিতে ব্যাট পেতে দিয়ে উইকেটরক্ষকের ক্যাচ হন ইংলিশ (১৯)। ৫১ রানে তৃতীয় উইকেটের পতন ঘটে অস্ট্রেলিয়ার। মোসাদ্দেক হোসেন দীর্ঘ ৪ বছর পর দলে ফিরেছেন। খেলেছেন ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। এরপর বল হাতে নিজের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেটের দেখা পেয়েছেন এই অলরাউন্ডার। তার ঘূর্ণি বুঝতে না পেরে বোল্ড হন অস্ট্রেলিয়ার সেট ব্যাটার কপার কনোলি (৩৫)। একশর আগে (৯১ রানে) ৪ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া।

এরপর নাহিদ রানার গতিতে পরাস্ত অস্ট্রেলিয়ার আরো এক ব্যাটার। ফিফটি হাতছাড়া করেন অ্যালেক্স ক্যারে (৪৭)। এবারো পেসে ভড়কে দেন রানা। ক্যারে ব্যাট ছুইয়ে ক্যাচ দেন উইকেটরক্ষক লিটন দাসকে। ম্যাট রেনশকে (২) এলবিডব্লিউ করেন মোসাদ্দেক। এরপর টানা দুই ওভারে দুই লোয়ার অর্ডারকে সাজঘরে ফেরান নাহিদ। ১৫৬ রানে ৯ উইকেট হারানোর পর আর ম্যাচে ফেরার সুযোগ ছিল না অস্ট্রেলিয়ার। ক্যামেরন গ্রিন পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেছেন মাত্র। এক প্রান্ত ধরে ফিফটি তুলে নেন তিনি ৬৪ বলে।

টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ ধাক্কা খায় দ্বিতীয় ওভারেই। ন্যাথান এলিসের বলে চার মারার পরের বলেই বিদায় নেন সাইফ হাসান (৫)। এভাবে শক্ত হাতে ডিফেন্স করে আউট হতে দেখা যায় সাইফকে নিয়মিতই। ম্লিপে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন মার্নাস লাবুশেন।

একটু পর অবশ্য এলিসের বলেই শান্তর সহজ ক্যাচ ছাড়েন সেই লাবুশেন। প্রথম বলেই দারুণ স্ট্রেট ড্রাইভে চার মেরে শুরু করা ব্যাটসম্যান এরপর ছুটতে থাকেন। আরেক পাশে তানজিদ শুরু থেকেই ছিলেন সাবলীল। দু’জনের ব্যাটে বাউন্ডারি আসতে থাকে নিয়মিত। ১৫ ওভারে ৯৭ রান তোলে বাংলাদেশ।

তানজিদের ফিফটি আসে ৪১ বলে। এরপর বেশি দূর যেতে পারেননি। এলিসের স্লোয়ার উড়িয়ে মারার চেষ্টায় থামে তার ইনিংস (৪৪ বলে ৫৪)। জুটি শেষ হয় ৯৬ রানে।

শান্ত পঞ্চাশে পা রাখেন ৫৭ বলে। এরপর একটু মন্থর হয়ে পড়েন। অনিয়মিত স্পিনার ম্যাট রেনশ জোড়া ধাক্কায় নাড়িয়ে দেন বাংলাদেশকে। নিজের বলে লিটন দাসের (৭) দুর্দান্ত ক্যাচ নেয়ার পর তিনি থামিয়ে দেন শান্তর পথচলাও (৮৬ বলে ৬৭)। ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন একটু নড়বড়ে। কিন্তু মোসাদ্দেক তাতে ভড়কে যাননি মোটেও। শুরু থেকেই এমন ব্যাটিং করতে থাকলেন, মনেই হলো না এত লম্বা সময় তিনি বাইরে ছিলেন!

ক্রিজে যাওয়ার একটু পরই অ্যাডাম জ্যাম্পাকে ছক্কায় উড়িয়ে দেন মাথার ওপর দিয়ে। বাউন্ডারি আসতে থাকে তার ব্যাটে নিয়মিত। আরেক প্রান্তে তাওহিদ হৃদয় ধুঁকছিলেন সিঙ্গল বের করতে। তবে উইকেট আগলে রেখে সহায়তা করেন তিনি জুটি গড়তে। এই জুটির ৭৫ রান বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয় কাক্সিক্ষত স্কোরের পথে। ৫১ বলে ৩১ রান করে হৃদয় ফেরেন জেভিয়ার বার্টলেটের স্লোয়ারে।

অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ (১২ বলে ৩) পারেননি ব্যাটিং ব্যর্থতার বলয় ছিঁড়ে বের হতে। দলের তিন শ’ ছোঁয়ার সম্ভাবনাও কমে যায় ওই সময়টায়। তবে শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে কার্যকর একটি জুটি গড়েন মোসাদ্দেক। ৪৯ বলে ফিফটি ছোঁয়ার পর শেষ সময়ের দাবিও মেটান মোসাদ্দেক। তাসকিনের ব্যাট থেকে আসে ১৬ বলে ২০ রান।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৮৪/৮ (সাইফ ৫, তানজিদ ৫৪, শান্ত ৬৭, লিটন ৭, হৃদয় ৩১, মোসাদ্দেক ৮৬*, মিরাজ ৩, তানভির ৫, তাসকিন ২০; বার্টলেট ১/৬২, এলিস ৩/৩৮, স্কট ২/৫৭, রেনশ ২/৩৫)।

অস্ট্রেলিয়া : ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯ (শর্ট ০, কনোলি ৩৫, লাবুশেন ১, ইংলিস ১৯, কেয়ারি ৪৭, গ্রিন ৫২*, রেনশ ২, স্কট ২, বার্টলেট ১, এলিস ৮, জ্যাম্পা ৬*; তাসকিন ১/২৮, মোস্তাফিজ ২/২৪, নাহিদ ৪/৪১, মিরাজ ০/২৩, মোসাদ্দেক ২/৩৭, তানভির ০/৩৩)।

ফল : বাংলাদেশ বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে জয়ী।

ম্যাচ সেরা : মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত

সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ তে এগিয়ে।