সংস্কারে একমত হওয়া প্রস্তাব এখনই বাস্তবায়নের তাগিদ

সিআইপিজির গোলটেবিল আলোচনা

Printed Edition
রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ : বর্তমান প্রেক্ষিত শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা : নয়া দিগন্ত
রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ : বর্তমান প্রেক্ষিত শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে একমত হয়েছে সেগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান বিচার, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রবাসী ভোটারদের ভোটদান এবং ফ্যাসিবাদী প্রশাসন ব্যবস্থা সরিয়ে নিরপেক্ষ দক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নয়তো জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব হয়ে পড়বে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।

‘রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ, বর্তমান প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে ‘সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি)’। প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হলে আয়োজিত আলোচনায় সিআইপিজির চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো: মোজাম্মেল হক সভাপতিত্ব করেন। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ড. মো: শরিফুল আলমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান আলোচক ছিলেন স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ।

শুরুতে দুটি কি-নোট উপস্থাপন করা হয়। ‘জুলাই সনদ : বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জন্মের পথপ্রদর্শক’ শীর্ষক কি-নোট উপস্থাপন করে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম এবং ‘ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং তা কাটিয়ে ওঠার উপায়’ শীর্ষক কি-নোট উপস্থাপন করে বক্তব্য রাখেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম।

এ ছাড়া পেনেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ুম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির এনডিসি, পিএসসি (অব:), দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, এস এফ আহমেদ অ্যান্ড কো:-এর সিনিয়র পার্টনার প্রখ্যাত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মো: এনামুল হক চৌধুরী এফসিএ, অতিরিক্ত সচিব (অব:) ও জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ প্রমুখ।

আলোচনায় প্রধান বক্তা স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে একমত হয়েছে সেগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন জরুরি। আর যেগুলোতে দ্বিমত থাকবে সেগুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা চালিয়ে গেলে একটা সময় তারও সমাধান হয়ে যাবে।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আগে পরিবেশ তৈরি প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রবাসী ভোটারদের ভোটদান নিশ্চিত, ফ্যাসিবাদী প্রশাসন ব্যবস্থা সরিয়ে নিরপেক্ষ, দক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন নিশ্চিত না করা গেলে জনগণের অকাক্সক্ষা পূরণে সরকার ব্যর্থ হবে।

প্রবাসীদের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রবাসীরা পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যগত ভুলগুলো শোধরাতে পারবে না। সরকার পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রবাসীদের ভোটার লিস্ট ও পোস্টাল ব্যালট করতে পারে। কেউ চাইলে সরাসরি ভোট দিতে পারবে অথবা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তারা অগ্রিম ভোট দিতে পারবে। এতে ভোটের সংখ্যা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের উপযোগী আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিপিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপর গুরুত্বারূপ করে তিনি বলেন, এ জন্য বর্তমান বাস্তবতায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা করা যেতে পারে। আর নির্বাচন পিআর হবে, না একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিতে হবে তা রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের উপকারভোগী গোষ্ঠীগুলো প্রতিবিপ্লবের বিষয়ে সচেতন নয়। যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা যদি অবহেলায় হারিয়ে ফেলি তাহলে স্বৈরাচার আবার ফিরে আসবে। তাই ভোটের আগে রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রয়োজন। অন্য দিকে আনুপাতিক পদ্ধতিতে ভোটের অনেক সুবিধা আছে। এই পদ্ধতিতে ভোট হলে সবার ভোট গণনা হয়। সবার ভোটের গুরুত্ব পায়। তবে এই পদ্ধতিতে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। এতে করে সরকার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না।

দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াত-বিএনপিসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ও মধ্যপন্থী দলগুলোর ঐক্য মজবুত করতে হবে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে এই অনির্বাচিত সরকারকে। তাই সবাইকে সাবধানে কথা ও কাজ করতে হবে। তার ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি না থাকার কারণে মব ভায়োলেন্স হচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি ও জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য উপযোগী যেকোনো পিআর পদ্ধতিতে হতে পারে।

অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব ছিল অরাজনৈতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যাতে আপামর সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাই জুলাই যে আকাক্সক্ষায় সংগঠিত হয়েছিল তা এই সনদে উল্লেখ থাকতে হবে। সব জাতি, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী চাকমা মারমাদের অধিকারও এই সনদের দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সমতা ও ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন আনয়নের জন্য এই সনদকে অবশ্যই আইনি দলিল হিসেবে রাখতে হবে। সংবাদ মাধ্যম, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠানকে পূর্বের সরকার ধ্বংস করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল যে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রায় দিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই সাংবিধানিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি জুলাই সনদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকতে হবে।

অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম বলেন, বর্তমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতিতে ম্যান্ডেটের ক্রাইসিস থাকে। যদি তিনটি প্রধান দল যদি নির্বাচন করে তা হলে মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৫১টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। আবার চারটি দল অংশগ্রহণ করলে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ভোট পেয়েও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। এ ছাড়া কিছু কিছু আসনে বা জেলায় এককেন্দ্রিক নির্বাচন হয় যা ঠেকানো যায় না। ১৫১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। ইউকে এবং ইউএসএ তে র‌্যাংক ভোটিং চালু হয়েছে, যা একটি আনুপাতিক পদ্ধতি। বর্তমান পদ্ধতির মতোই পিআর পদ্ধতিতেই ভোট হতে পারে যেখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিতে ৩০০ আসনে নির্বাচন হবে এবং ৩০০ আসনের জন্য আনুপাতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির এনডিসি, পিএসসি (অব:) বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দৃশ্যমান বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা জনগণ দেখতে পারছে না। এখন ১/১১ এর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য সশস্ত্রবাহিনী ও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফ্যাসিস্ট সরকারের তৈরি করা ভোটার লিস্ট, আসনের সীমানা ও প্রশাসন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।

সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ুম বলেন, সনদ না সংবিধান এই বিতর্ক তোলা হচ্ছে। সনদের আলোকেই সংবিধান রচনা করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদেরকে সংস্কার করতে হবে। স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া প্রশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে।

দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, জুলাই সনদের যদি আইনি ভিত্তি না থাকে তা হলে এই সনদের কোনো গুরুত্ব থাকবে না। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা হলো সাংবিধানিক ভিত্তি। তাই জুলাই সনদের বিষয়গুলো এখন থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। পরবর্তী সরকারের জন্য ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, যদি জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচন পদ্ধতি ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে একমত না হয় তবে ঘোষিত নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

মো: এনামুল হক চৌধুরী এফসিএ বলেন, এমপিদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা। আইন প্রণেতারা এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সম্পৃক্ত থাকেন বিধায় আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। তাই আমাদেরকে আইন প্রণেতাদেরকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হতে বিরত রাখতে হবে। ভোটার লিস্ট দ্বারা সঠিক ভোটার চিহ্নিত করা যায় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাই সঠিক ভোটের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রবাসীদের ভোটদান নিশ্চিত করতে হবে।