মিডলইস্ট মনিটর
ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর এতদিনের চেনা প্রতিরক্ষা কাঠামো ও মার্কিন সামরিক নির্ভরতার এক বড় সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কুয়েতের মতো ধনী দেশগুলো মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত প্রমাণ করেছে, শুধু উন্নত অস্ত্র থাকলেই চলে না; যুদ্ধকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সার্বভৌমত্ব রক্ষা কঠিন।
এই যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে মার্কিন প্যাট্রিয়ট বা থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি চীনের তৈরি ড্রোন বিধ্বংসী সিস্টেম ও উইং লুং ড্রোনের ব্যাপক উপস্থিতি নজর কেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল চীনের উত্থান নয়, বরং মার্কিন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্কটেরই বহিঃপ্রকাশ। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেন ও নিজস্ব মজুদ ঠিক রাখতে গিয়ে ২০২৩ সাল থেকে আমেরিকার উৎপাদন লাইন সৌদি আরবের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৬০টি থাড ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় ব্যাকলগ আটকে রেখেছে, যা ২০২৭ সালের আগে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নাগাল পেলেও, যুদ্ধের সময় পর্যাপ্ত অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না ওয়াশিংটন।
তা ছাড়া সৌদি আরব তার ‘ভিশন ২০৩০’ এর আওতায় প্রতিরক্ষা খাতে ৫০ শতাংশ স্থানীয়করণের লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন লকহিড মার্টিন ও বোয়িংয়ের সাথে যৌথ কারখানা স্থাপন করলেও মূল নিয়ন্ত্রণ এখনো বিদেশী প্রকৌশলীদের হাতে। সফটওয়্যার আপগ্রেড, ইন্টারফেস ডিজাইন ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের মতো কৌশলগত বিষয়গুলো এখনো মার্কিনীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম বিলম্ব ঘটছে। একে বিশেষজ্ঞরা ‘সক্ষমতার পরনির্ভরশীলতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি, ওয়াশিংটন কর্তৃক ইসরাইলকে দেয়া বিশেষ সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব (কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ) নীতি এবং আরব দেশগুলোর ওপর প্রযুক্তি হস্তান্তরে কড়াকড়ি উপসাগরীয় অংশীদারদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই সুযোগে বিকল্প হিসেবে চীন, তুরস্ক ও রাশিয়ার বাজার তৈরি হচ্ছে। চীন কেবল অস্ত্র বিক্রিই করছে না, বরং ২০২৬ সালের মার্চে সৌদি আরবের ‘গামি’ এবং চীনের ‘এভিক’-এর মধ্যে হওয়া ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি অনুযায়ী জেদ্দায় বছরে ৪৮টি ‘উইং লুং-৩’ ড্রোন তৈরির যৌথ অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপন করছে। অন্য দিকে, কুয়েত ও কাতার ২০২৩ সাল থেকেই তুর্কি বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোনের বড় ক্রেতা। গোলাবারুদের ঘাটতি ও ক্রমাগত ড্রোন হামলা ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ক্রুজ মিসাইল তৈরিতেও যৌথ চুক্তি হচ্ছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনও সৌদি, ইউএই ও কাতারের সাথে ১০ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা এখন এই অঞ্চলে অবস্থান করে সস্তায় ইরানি ড্রোন ধ্বংসের বাস্তব যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। পাশাপাশি, আমিরাত ও সৌদি আরব রাশিয়ার তৈরি ‘প্যান্টসির-এস১’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে তাদের তেল ও পানি শোধনাগার রক্ষা করছে।
অবশ্য এই বহুমুখীকরণকে মার্কিন বলয় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়া বলা যাবে না। কারণ আমেরিকার মতো নিরাপত্তা ছাতা বা সমমানের এয়ার ডিফেন্স দেয়ার ক্ষমতা চীন বা তুরস্কের নেই। তবে যুদ্ধের বাস্তবতায় উপসাগরীয় নেতারা বুঝতে পেরেছেন, ডেটা, প্রকৌশল জ্ঞান ও সফটওয়্যারের নিজস্ব মালিকানা ছাড়া প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অসম্ভব। আর এই সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েই এখন ব্যস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।



