মেসি-সালাহ লড়াইয়ে শেষ আটে কারা

আর্জেন্টিনা-মিসর

Printed Edition
শিরোপা ধরে রাখার মিশন সামনে রেখে নির্ভার চলতি বিশ্বকাপে ৭ গোল করা মেসি। (ডানে) শেষ ষোলতে মাঠে নামার আগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ঠেকাতে অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন মিসরের ফুটবলাররা : ইন্টারনেট
শিরোপা ধরে রাখার মিশন সামনে রেখে নির্ভার চলতি বিশ্বকাপে ৭ গোল করা মেসি। (ডানে) শেষ ষোলতে মাঠে নামার আগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ঠেকাতে অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন মিসরের ফুটবলাররা : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্বকাপের চলমান আসরে এখন পর্যন্ত অপরাজিত আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে তিনটিতে জয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে সেরা হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল লিওনেল মেসির দল। শেষ ৩২-এর ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেকেই চমক দেখানো আফ্রিকার দেশটির বিপক্ষ্যে কষ্টের লড়াই শেষে ৩-২ গোলের জয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা নিশ্চিত করেছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। অন্য দিকে গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে মিশন শুরু করেছিল মিসর। পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারানোর পর শেষ ম্যাচেও মধপ্রাচ্যের দেশ ইরানের বিপক্ষে ড্রতে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে জায়গা করে নিয়েছিল আরব দেশটির। আর শেষ ৩২-এর ম্যাচে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল মোহাম্মদ সালাহরা। এবার তাদের সামনে ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করার মিশন। সেই মিশনে পাড়ি দিতে হবে অনেক কঠিন পথ। কারণ তাদের সামনে যে রয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের দেয়াল। কোয়ার্টারে জায়গা পেতে হলে এবার জয় পেতে হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১০টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটালান্টায় শুরু হবে এই মহারণ।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াইয়ে মাঠে নামবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মিশর। মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে জয়ী দল জায়গা করে নেবে কোয়ার্টার ফাইনালে। এক দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনা, অন্য দিকে মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার মিশনে মরিয়া মিসর।

শেষ ষোলোর এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লিওনেল মেসি ও মোহাম্মদ সালাহর দ্বৈরথ। বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা নিজেদের জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রাণভোমরা হিসেবে খেলছেন মেসি। গোল করা, সুযোগ তৈরি করা এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ- সব ক্ষেত্রেই দলের মূল চালিকাশক্তি এই খুদে জাদুকর। অন্যদিকে শুধু গোল করার জন্যই নন, কাউন্টার অ্যাটাকে গতি এনে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় অস্ত্র সালাহ।

আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের জন্য শেষ ৩২-এর লড়াইটা যতটা স্নায়ুচাপের ছিল, তাদের দলও এখন সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে টানা আটটি ম্যাচ জয়ের এক প্রশংসনীয় ধারায় রয়েছে। এই সব ক’টি জয়েই তারা দুই বা তার বেশি গোল করেছে; উত্তর আমেরিকায় এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে তারা ১১টি গোল করেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে দুই ঘণ্টার ক্লান্তিকর লড়াইয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বিধ্বস্ত ছিল আর্জেন্টিনা। নাহুয়েল মলিনা, এনজো ফার্নান্দেজ বা ফাকুন্দো মেদিনা চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা কেউই পরের দিনের সম্পূর্ণ রিকভারি সেশন শেষ করতে পারেননি।

মেদিনার সমস্যাটিকে ক্র্যাম্প বলে উড়িয়ে দেয়া হলেও লেফট-ব্যাকে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো প্রস্তুত আছেন। অন্য দিকে উইঙ্গার নিকো গঞ্জালেসের গোড়ালি মচকে যাওয়ার খবরে তার খেলা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছেন মেসির। যিনি শেষ ৩২-এ দু’টি ভিন্ন বিশ্বকাপে সাতটি করে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়। নকআউট পর্বে সর্বাধিক ১২টি গোলে অবদান রেখে সর্বকালের নতুন রেকর্ডও গড়েন।

তবে মিসরের জন্য একটি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো সালাহর শারীরিক অবস্থা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি কিছুটা সতর্কভাবে খেলেছেন এবং আগের হ্যামস্ট্রিং সমস্যার প্রভাব পুরোপুরি কেটেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবুও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাকে ঘিরেই পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন কোচ হোসাম হাসান।

মিসরের ৯২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা পেয়েছে। তবে ইতিহাসে এই প্রথমবার তারা সত্যিকারের যোগ্যতার ভিত্তিতে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে। ১৯৩৪ সালের দলটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সরাসরি প্রবেশ করেছিল- যেখানে মাত্র ১৬টি দল অংশ নিয়েছিল; কিন্তু গ্রুপ পর্বে উদ্বোধনী বিশ্বকাপের জয়ের পর এবার আর্লিংটনে আরো একটি ঐতিহাসিক বিজয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেয় ফারাওরা।

শেষ ৩২-এর ম্যাচে লড়াকু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলাকে পেনাল্টি পর্যন্ত নিয়ে গেলেও মিসর স্পট কিক থেকে শতভাগ সাফল্য পায়। যার আংশিক কৃতিত্ব ছিল সালাহর দুঃসাহসিক পানেঙ্কা শটের। অন্য দিকে সকারুস ডিফেন্ডার হ্যারি সাউটার এবং লুকাস হ্যারিংটন দুজনেই বল বাইরে মেরে ফারাওদের পরবর্তী পর্বে পৌঁছে দেন। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হওয়ার আগে রক্ষণভাগের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় এখন তারা আবেগ একপাশে সরিয়ে রেখেছে। হোসাম হাসানের দল এর আগে টানা তিনটি ম্যাচে কোনো গোল হজম না করলেও টানা ছয়টি ম্যাচে অন্তত একটি করে গোল খেয়েছে।

এখন পর্যন্ত প্রথম এবং একমাত্র সাক্ষাতেও ফারাওরা আটকাতে ব্যর্থ হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ২০০৮ সালের একটি প্রীতিম্যাচে সার্জিও আগুয়েরো ও নিকোলাস বুরদিসোর গোলে তারা ২-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়। দলের প্রধান তারকা মেসি পেশির চোটের কারণে সেই ম্যাচে খেলতে পারেননি, কিন্তু ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা এবার সালাহর সাথে এক দর্শনীয় লড়াইয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ৮০ মিনিটে লেফট-ব্যাক করিম হাফেজকে মাঠ থেকে তুলে নেয়া হয়। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর পাওয়া গেছে; কেউ কেউ ক্লান্তির কথা বলছেন, আবার হ্যামস্ট্রিংয়ে সামান্য আঘাতের কথা বলছেন। মেসির ডান প্রান্তের দাপটের মুখোমুখি হওয়ার আগে হাফেজের অনুপস্থিতি মিসরের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা হবে, কারণ আরেক লেফট-ব্যাক আহমেদ ফাতুহ নিজের উরুর চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে পারেননি এবং এই ম্যাচে তার অংশগ্রহণ এখনো অনিশ্চিত।

মিসরের রক্ষণভাগের তৃতীয় এবং শেষ দুশ্চিন্তাটি হলো নিসের সেন্টার-ব্যাক মোহাম্মদ আবদেলমোনেমকে নিয়ে। যিনি গ্রুপ পর্বে ইরানের বিপক্ষে পাওয়া গোড়ালির চোটের কারণে শেষ-৩২ পর্বের জয়টিও মিস করেছিলেন এবং অনিশ্চিত তালিকায় তিনিও রয়েছেন। তবে একটি ইতিবাচক খবর হলো, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মোহানাদ লাশিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হলুদ কার্ডের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আবারো খেলার জন্য প্রস্তুত।

তবে পরিসংখ্যানের দিক থেকে এই ম্যাচে স্পষ্ট ফেবারিট আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং বড় ম্যাচ জেতার মানসিকতা নিঃসন্দেহে এগিয়ে রাখছে আলবিসেলেস্তেদের। তবে নকআউট ফুটবলে ছোট একটি ভুলই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। মিসর ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলতে পারে এবং প্রয়োজন হলে টাইব্রেকারেও স্নায়ুর চাপ সামলাতে সক্ষম। সব মিলিয়ে এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ। অতীতে একবারই মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। ২০০৮ সালের ২৬ মার্চ হওয়া সেই ম্যাচে মিসরকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার কি আরো এগিয়ে যাওয়ার পালা তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের, নাকি সেই হারের প্রতিশোধ মিসরের।