চট্টগ্রামে ‘এল নিনো’র প্রভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা!

হুমকির মুখে পড়তে পারে উৎপাদন

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

জুনের প্রথম সপ্তাহ। সাধারণত এই সময়ে চট্টগ্রামে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। পাহাড় থেকে নেমে আসে জলধারা, ভরে ওঠে কর্ণফুলীর বুক। কৃষকের মুখে ফোটে তৃপ্তির হাসি। কিন্তু এবার ছবিটা অন্যরকম। রোদ ঝাঁজালো, বাতাস গরম, আকাশে মেঘ এই আছে, এই নেই। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি কম হতে পারে। উল্টো কোথাও কোথাও তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁতে পারে।

এর মধ্যেই নতুন সতর্কবার্তা এলো বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা থেকে। এল নিনো সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা এখন ৮০ শতাংশ। চট্টগ্রামের জন্য এই সঙ্কেত কেবল আবহাওয়ার খবর নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, জীবিকা; সব কিছুর ওপর আসন্ন চাপের পূর্বাভাস বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে চট্টগ্রাম ও এই অঞ্চলে বর্ষা দেরিতে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষক। হুকির মুখে পড়বে উৎপাদন। উপকূলে বাড়বে লবণাক্ততা। প্রজনন বিঘিœত হবে হালদার। বন্দরনগরীতে বাড়বে তাপ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন শ্রমজীবী মানুষ।

এল নিনো কী

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সাথে সম্পর্কিত একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এটি পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বর্ষা বিলম্বিত হতে পারে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। আগামী নভেম্বর নাগাদ এই অঞ্চলে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা নব্বই শতাংশে পৌঁছতে পারে।

চট্টগ্রামের জন্য এর মানে হলো, যে বৃষ্টির অপেক্ষায় পাহাড়ি কৃষক আছেন, যে বর্ষার অপেক্ষায় হালদার মাছ ডিম দেবে, যে জলের প্রতীক্ষায় শুকিয়ে যাওয়া কূপ ভরবে, সেই বৃষ্টি আসতে পারে দেরিতে, আসতে পারে কম।

চট্টগ্রামের হুমকির মুখে পড়তে পারে কৃষি

চট্টগ্রামের কৃষি পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর। মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী- এই উপজেলাগুলোর কৃষিজমি বর্ষার জলের জন্য অপেক্ষায় থাকে প্রতি বছর। আমন ধান রোপণের সময় জুলাই-আগস্ট। কিন্তু বর্ষা বিলম্বিত হলে চারা রোপণ পিছিয়ে যাবে। দীর্ঘ খরায় জমি শুকিয়ে ফেটে যাবে। কৃষককে সেচের ওপর নির্ভর করতে হবে, বাড়বে উৎপাদন খরচ।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, শীতকাল ছোট হয়ে আসছে, প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন না করতে পারলে কৃষি খাত বড় সঙ্কটে পড়বে।”

উপকূলে বাড়তে পারে লবণাক্ততা

চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, সন্দ্বীপ- এই এলাকাগুলোর সামনে বাড়তি এক বিপদ অপেক্ষা করছে। বৃষ্টি কম হলে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে। তখন সমুদ্রের লোনাপানি ঢুকে পড়ে নদী ও খালে। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ে। ধান চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের চাষ ব্যাহত হয়। সঙ্কট দেখা দেয় পানীয় জলের।

বন্দর নগরীতে অস্বস্তিকর তাপমাত্রা

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত দুই দশকে কমেছে গাছ, বেড়েছে পাকা সড়ক ও ভবন। কাটা হয়েছে পাহাড়, ভরাট করা হয়েছে জলাধার। এই ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন নগরীকে করে তুলেছে তাপের চুলো। গরম বাতাস, বাড়িতে এসি চলছে। এই এসি থেকে বের হওয়া তাপ আরো গরম করছে বাইরের বাতাসকে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মো: মমিনুল ইসলাম বলেছেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়ত, এখন দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও কমছে না। ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে টানা ৩৬ দিন তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেছেন, নগরাঞ্চলে গাছপালা ও জলাধার বাড়ানো ছাড়া তাপমাত্রা কমানোর কার্যকর বিকল্প নেই। চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে, জলাধার ভরাট অব্যাহত থাকলে, নগরে সবুজ না বাড়লে; তাপের বিরুদ্ধে এই নগরীর প্রতিরোধ শক্তি ক্রমেই কমতে থাকবে। চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। যার ফল ভোগ করতে হতে পারে কোটি মানুষকে।