ক্রীড়া প্রতিবেদক
ফুটবল মাঠে শুধু গোল বা অ্যাসিস্টই একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের একমাত্র মাপকাঠি নয়। মাঠে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বলের দখল ধরে রাখা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এমনই এক কাজ করে দেখালেন স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে বেলজিয়ামকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছে স্পেন। অথচ সেই ম্যাচে গোল নেই, অ্যাসিস্টও নেই। তার পরও ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার উঠেছে স্পেনের এই তরুণ তারকার হাতে। ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা স্পেনের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েই ম্যাচসেরার স্বীকৃতি পান ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গার।
সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফাবিয়ান রুইজের গোলে প্রথমে এগিয়ে যায় স্পেন। পরে প্রথমার্ধেই চার্লস ডি কেটেলারের গোলে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। সমতায় ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি রেড ডেভিলসদের। শেষ দিকে বদলি হিসেবে মাঠে নামা মিকেল মেরিনোর গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। এই গুরুত্বপূর্ণ জয়ে ইয়ামালের অবদান ছিল পরিসংখ্যানের বাইরে। বল নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি- সব ক্ষেত্রেই অনন্য ছিলেন এই তরুণ সেনসেশন।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে গত পরশু শেষ হওয়া ম্যাচে স্কোরশিটে নাম না থাকলেও পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনের আক্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন ইয়ামাল। ডান প্রান্তে তার গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার দক্ষতা এবং একের পর এক সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা বারবার আক্রমণে এগিয়ে নিয়েছে লা রোজাদের। তার উপস্থিতির কারণেই সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হয়েছে বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে।
বিশ্ব ফুটবলে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইয়ামাল। ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলের জার্সিতেও ধারাবাহিকভাবে উজ্জ্বল তিনি। তার আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেয়ার মানসিকতা স্পেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
ম্যাচ শেষে স্পেন শিবিরেও ইয়ামালের প্রশংসা করেন সতীর্থ ও কোচিং স্টাফ। যদিও গোল করতে পারেননি, তবুও দলের জয়ে তার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং আক্রমণের ধার বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে স্পেন মুখোমুখি হবে গত আসরের রানার্সআপ ফ্রান্সকে।
‘সম্ভাব্য সেমিফাইনাল’ নিয়ে আগে থেকেই চলছিল কথার লড়াই। বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেনের জয়ের পর ওই লড়াই এবার সত্যিই মাঠে গড়াবে। রেড ডেভিলসদের বিপক্ষে ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে লেস ব্লুজদের বিপক্ষে ম্যাচের আগে এবার হুঙ্কার ছুড়লেন ইয়ামাল। তরুণ এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড মনে করেন, তাদের দলকে ভয় পাওয়া উচিত ফ্রান্সের।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে আগামী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় ১টায় ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন। তিন বছরের মধেথ্য দুই দলের এটা হবে তৃতীয় লড়াই। ২০২৪ সালে ইউরোর সেমিফাইনালে ও পরের বছর নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে জয় পেয়েছিল স্পেন। বেলজিয়ামকে হারানোর পর সেমিফাইনাল ম্যাচ নিয়ে কথা বললেন বার্সেলোনার উইঙ্গার ইয়ামাল।
ইয়ামাল বলেন, ‘যদি ফ্রান্সের কাউকে ভয় পেতে হয়, সেটা আমরা। আগেও আমরা ওদের বিদায় করেছি। ওদের আমরা দুইবার হারিয়েছি। সত্যি বলতে, আমি মনে করি বিশ্বকাপে আমরাই সেরা দুই দল। আমরা দেখব কী ঘটে, তবে আমাদের কোনো ভয় নেই।’
বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার সেমিফাইনালে খেলবে স্পেন। এর আগে ২০১০ সালে সেমিফাইনালে জার্মানিকে ১-০তে হারানোর পর শিরোপাও জয় করেছিল লা রোজারা। অন্য দিকে ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপেও ফাইনাল খেলেছিল ফ্রান্স। এবার স্পেনকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার ফাইনালে খেলার লক্ষথ্য নিয়ে নামবে ফ্রান্স।
চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে আসর শুরু করেছিল স্পেন। পরের ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয়া আর শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে লা রোজারা। ছন্দে ফেরা দলটি শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারানোর পর পর্তুগালের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে জিততে হয়েছে ৮৮ মিনিটের গোলে। ক্রমেই উন্নতি করা লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের প্রাণভোমরা ইয়ামাল মনে করেন, ফল যেমন দেখাচ্ছে এর চেয়ে ভালো ফুটবল খেলছেন তারা।
ইয়ামাল বলেন, ‘মনে হতে পারে যে, আমরা খুব ভালো খেলছি না। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে দেখুন, প্রতিটি দলই আমাদের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক থাকে। কেউই আমাদের সাথে সমানে-সমান খেলার চেষ্টা করেনি। দিন শেষে আমরা জয় তুলে নেই, যেটা আজও পেরেছি (গত পরশু)। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেমিফাইনালে উঠতে পেরে ভীষণ খুশি। ফাইনাল পর্যন্ত আমরা টুর্নামেন্টে থাকতে চাই।’
কেন ম্যাচ সেরা ইয়ামাল
বেলজিয়ামের বিপক্ষে রোমাঞ্চে ভরপুর ম্যাচ জয়ে সেরা খেলোয়াড় হন ইয়ামাল। যদিও তিনি গোল করেননি, এমনকি কোনো সরাসরি অ্যাসিস্টও ছিল না। তবে পুরো ম্যাচে তার প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। তাই ম্যাচসেরা হওয়ার দাবিদার ছিলেন ইয়ামালই। পুরো ম্যাচে রেড ডেভিলসদের গোলমুখে ছয়টি শট নেন ইয়ামাল। যার মধ্যে দু’টি ছিল অন টার্গেট এবং দুইটি ব্লক করেছিল প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার। সবচেয়ে আলোচনায় থাকা পরিসংখ্যানটি হলো তার ৮টি ড্রিবলের চারটিই ছিল সফল। পুরো ম্যাচজুড়ে বেলজিয়ামের ডিফেন্ডারদের বারবার কাটিয়ে আক্রমণে গতি আনেন ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। একের পর এক ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে স্পেনের আক্রমণের মূল ভরসায় ছিলেন তিনি। পাসিংয়েও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ৪৬টি পাসের মধ্যে সফল ছিল ৩৯টি।
ম্যাচে ইয়ামালের অবিরাম চাপ এবং ড্রিবলিংয়ের কারণে বেলজিয়ামের রক্ষণকে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ফাবিয়ান রুইজ, চার্লস ডি কেটেলার ও মিকেল মেরিনো তিনটি গোল করলেও পুরো ম্যাচে ইয়ামালের মতো ধারাবাহিক প্রভাব রাখতে পারেননি। তাই গোল বা অ্যাসিস্ট না থাকলেও ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ সৃষ্টি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে অস্থিরতা তৈরির জন্য ফিফার ম্যাচসেরা নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে যথার্থ বলেই মনে করছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।



