বিদ্রোহী বাহিনীর অগ্রাভিযান ব্যাহত বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে বিমান হামলা

রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পাল্টা অভিযান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হামলার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পাল্টা বিমান হামলা শুরু করেছে। আরাকান আর্মি এই অভিযানে মিয়ানমার সামরিক জান্তা (তাতমাদো) বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে বলে অভিযোগ করে বলেছে- রাখাইনে চলমান তীব্র লড়াইয়ে নিজেদের বিপুল সেনা হতাহতের প্রতিশোধ নিতে ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু করেছে জান্তার বিমানবাহিনী।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নারিনজারার প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, জুনের শুরু থেকেই রাখাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় টাউনশিপগুলোতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এই বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

হামলার বিবরণ ও প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলো

তৌঙ্গুপ টাউনশিপ : ১ জুন সকাল আনুমানিক ৯টা থেকে জান্তার চারটি ফাইটার জেট এবং একটি ওয়াই-১২ হেলিকপ্টার গানশিপ তৌঙ্গুপের সা পিয়েন এবং কিন তাউং গ্রামের আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় একযোগে বোমাবর্ষণ করে। যুদ্ধ থেকে বাঁচতে এই অঞ্চলের জঙ্গল ও পাহাড়ে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ অস্থায়ী তাবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জান্তা বাহিনী সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অথবা স্রেফ আতঙ্ক ছড়াতে এই গভীর জঙ্গল ও পাহাড়গুলোকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।

কিয়াকফিউ টাউনশিপ : একই দিন রাত ৮টার দিকে তৌঙ্গুপ-রামরি সড়কের পাশে কালা পং তাউং এবং রাম থিত গ্যি গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় জান্তা অন্তত চারটি শক্তিশালী বোমা ফেলে। এই এলাকাটি মূলত তৌং মও গ্যি নৌঘাঁটি সংলগ্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রধান আশ্রয়স্থল ছিল। হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্থানীয় একটি বাঁধ এলাকা, যার চারপাশে শত শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী আইডিপি বলেন, ‘আমরা স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছিলাম। কিন্তু তাদমাদাও এখানেও আমাদের ওপর আকাশ থেকে বোমা ফেলল। তাদের লক্ষ্য কোনো সামরিক অবস্থান ছিল না, ছিল আমাদের মতো অসহায় মানুষ।

কেন এই হামলা : সামরিক বিশ্লেষক এবং স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, জান্তা বাহিনীর এই বিমান হামলার পেছনে সামরিক দূরদর্শিতার পরিবর্তে পরাজয়ের গ্লানি থেকে আসা হাতাশাজনক পদক্ষেপ।

স্থলযুদ্ধে ভরাডুবি : কিয়াকফিউ অঞ্চলে অবস্থিত জান্তার অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি ‘তৌং মও গ্যি’ নৌঘাঁটির সুরক্ষায় নিয়োজিত অগ্রবর্তী ক্যারাভানের ওপর আরাকান আর্মি তীব্র আক্রমণ চালায়। মে মাসের শেষ থেকে জুনের ১ তারিখ পর্যন্ত চলা এই সম্মুখ সমরে জান্তার এক ক্যাপ্টেনসহ ৪০ জনেরও বেশি সেনা নিহত হয়।

নৌঘাঁটি রক্ষা করার মরিয়া চেষ্টা : আরাকান আর্মি বর্তমানে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৌং মও গ্যি নৌঘাঁটিটিকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। এই ঘাঁটিটি মূলত চীনের অর্থায়নে তৈরি গভীর সমুদ্র বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় জান্তার কাছে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। স্থলপথে সেনা পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে জান্তা এখন আকাশপথের ওপর নির্ভরশীল।

আরাকান আর্মির সূত্রগুলো দাবি করেছে,এর আগে জান্তা বাহিনী নৌঘাঁটির অদূরে অবস্থিত সানে নামক একটি ছোট শহরে অগ্নিসংযোগকারী বোমা নিক্ষেপ করে। যার ফলে সাধারণ মানুষের শত শত ঘরবাড়ি এবং দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাতমাদো সূত্র এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

সেনাবাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় অসংখ্য সাধারণ মানুষ এবং আইডিপি আহত ও নিহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে রাখাইনজুড়ে জান্তা সরকারের যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি রাখার কারণে সুনির্দিষ্ট হতাহতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আকাশে ড্রোন ও নজরদারি বিমান ওড়ার পরপরই ফাইটার জেটগুলো হামলা চালাচ্ছে। ফলে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষকে আকাশে নজরদারি বিমান দেখামাত্রই বাঙ্কারে বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত: মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্মুখ সমরে আরাকান আর্মির কাছে সাফল্য পাচ্ছে না। তারা কোনো যুদ্ধে হারলে পাল্টা বিমান অভিযান শুরু করে। আরাকান আর্মি উল্লেখ করে, জান্তা বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা চালায় যাতে সাধারণ মানুষ ভয়ে আরাকান আর্মিকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়। এতে রাখাইনে মানবিক সঙ্কট এক চরমতম বিন্দুতে পৌঁছাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।