বিএমইউ ও বারডেমে গবেষণা

পুরুষের বন্ধ্যত্ব বেশি বিষণœতাও বেশি, প্রয়োজন সমন্বিত কাউন্সেলিং

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নারীদের চেয়ে পুরুষদের বন্ধ্যত্ব যেমন বেশি তেমনি তাদের বিষণœœতাও বাড়ে। একই সাথে মানসিক চাপ ও হতাশাও বাড়ে অনেক। সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিএমইউর গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগ এবং বারডেমের উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগে ৬৫৮ জন বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় উভয় হাসপাতালের ৩২০ জন পুরুষ ও ৩৩৮ জন নারী ছিলেন। বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং যৌন জীবনের প্রভাবও মূল্যায়ন করা হয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেক্সুয়াল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণার ফল। এটা যৌনস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং দাম্পত্য সম্পর্কবিষয়ক গবেষণার অন্যতম স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষ বন্ধ্যত্ব রোগীরা যৌন সমস্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ পুরুষ কোনো না কোনো যৌন সমস্যায় ভুগছিলেন, যেখানে নারীদের মধ্যে যৌন সমস্যার হার ছিল ১৩.৯ শতাংশ। বন্ধ্যত্ব শনাক্ত হয়ে গেলে পুরুষের ইরেক্টাইল ডিসফাংশন এবং আরলি ইজাকুলেশন বা প্রিম্যাচিউর ক্লাইমেক্স নতুন করে দেখা যাওয়া প্রধান যৌন সমস্যা হয়ে ওঠে। ডায়গনোসিস হয়ে গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যে যৌন অতৃপ্তি বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশের দুই বিশেষায়িত হাসপাতালে করা এ গবেষণায় আরো দেখা যায় যে, বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের পর পুরুষরা নারীদের তুলনায় দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্পর্কগত সমস্যার সম্মুখীন বেশি হয়ে থাকেন। সন্তান ধারণে ব্যর্থতার অনুভূতি পুরুষদের আত্মমর্যাদা, পৌরুষত্ব এবং সামাজিক পরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে ওই নেতিবাচক প্রভাব তাদের যৌন জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্য দিকে, অনেক নারী বন্ধ্যত্বের প্রেক্ষাপটে যৌন আকর্ষণের তুলনায় প্রজনন সক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন ধরনের চাপ ও দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে।

এ ব্যাপারে গবেষণা দলের প্রধান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ শামসুল আহসান বলেন, বন্ধ্যত্ব কেবল একটি প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি একটি জটিল মানসিক, সামাজিক ও দাম্পত্য সমস্যা। তাই বন্ধ্যত্ব ব্যবস্থাপনার জন্য প্রজনন চিকিৎসার পাশাপাশি যৌন চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিংকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমন্বিত পদ্ধতি দম্পতিদের জীবনমান উন্নয়ন, দাম্পত্য সম্পর্কের স্থিতিশীলতা এবং চিকিৎসার সামগ্রিক সফলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডাক্তার শামসুল আহসান আরো বলেন, চিকিৎসার আওতায় আনলে এবং এমন দম্পতিকে বেটার কেয়ার দিতে পারলে অনেকের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তিনি বন্ধ্যা দম্পতির উদ্দেশে বলেন, হতাশ হবেন না, প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন, সফলতা আসতেও পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ৬ জনের মধ্যে অন্তত ১ জন (মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭.৫ শতাংশ) বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও, চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে বন্ধ্যত্বের হার ২০ শতাংশের উপরে এবং তা দিন দিন বাড়ছে। কোনো কোনো সময় তা ২৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। সাধারণত এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণে অক্ষমতাকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়।

গবেষণারটির সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: ফারজানা দীবা, বারডেম উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: নুসরাত মাহমুদ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের ডা: লিউজা মুবাসসারা, ডা: সামিনা আক্তার, ডা: মো: আল-আমিন খান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা: আহসান আজিজ সরকার এবং ইতালির ইউনিভার্সিটি অব রোম ‘টর ভার্গাটা’র বন্ধ্যত্ব গবেষক ড. আন্দ্রেয়া সানসোনে।