দেশজুড়ে পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেরিতে কথা বলা (স্পিচ ডিলে), সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অটিজম-সদৃশ আচরণের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল এখন এই সঙ্কটকে একটি ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে সামনে আনছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্মার্টফোন, ট্যাব ও ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহারকে। সাধারণত চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের মাইলফলক হলো, অন্যের প্রতি আগ্রহ দেখানো, দলে খেলা এবং সহযোগিতার ধারণা বোঝা। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এই মাইলফলকগুলো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং প্রি-স্কুল শিশুদের সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।
সাত বছরের আবির (ছদ্মনাম)। বয়স অনুযায়ী এখন তার বন্ধুদের সাথে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, অনর্গল প্রশ্নে মা-বাবাকে অতিষ্ঠ করে তোলার কথা। কিন্তু ঢাকার একটি ফ্ল্যাট বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে থাকা আবিরের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত নীরবতা চোখে পড়ে। তার সামনে খাটের ওপর রাখা একটি স্মার্টফোন, যেখানে তীব্র গতিতে চলছে রঙিন অ্যানিমেশন কার্টুন।
আবিরের মা সুলতানা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, ও যখন ছোট ছিল, কান্নাকাটি করলেই হাতে ফোন দিতাম। শান্ত হয়ে যেত। নিজের হাতে স্ক্রিন টাচ করতে পারে। কিন্তু সাত বছরে পড়েছে, অথচ এখনো ও গুছিয়ে একটা পুরো বাক্য বলতে পারে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সৈয়দ তানভীর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মোবাইল আসক্তি ও স্পিচ ডিলে (দেরিতে কথা বলা) শিশুদের মধ্যে অটিজমের যে লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে, তার সাথে মোবাইল আসক্তির একটি বড় সংযোগ রয়েছে। মোবাইলে অতিরিক্ত আসক্ত হওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে ‘স্পিচ ডিলে’ বা দেরিতে কথা বলার সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না। বাচ্চারা যখন মানুষের সাথে যোগাযোগের বদলে ডিভাইসে বেশি সময় কাটায়, তখন তাদের কমিউনিকেশন স্কিল বা যোগাযোগের দক্ষতা তৈরি হয় না, যা অটিজম বা কথা বলতে দেরি হওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
তিনি বলেন, অটিজমকে মূলত ‘অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিসঅর্ডার’ (এএসডি) বলা হয়। একে ‘স্পেক্ট্রাম’ বলার কারণ হলো, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে। তবে এর মূল সমস্যাটি হচ্ছে ‘কমিউনিকেশন ডিজঅ্যাবিলিটি’ বা যোগাযোগের অক্ষমতা। অর্থাৎ, আক্রান্ত শিশুটি তার চারপাশের পরিবেশ বা মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে চায় না, যোগাযোগ স্থাপনে তার কোনো আগ্রহ থাকে না এবং সে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি জগতের মধ্যে মগ্ন থাকে।
পারিবারিক পরিবেশ ও বাবা-মায়ের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় বাবা-মায়েরা নিজেদের বিরক্তি এড়াতে, সন্তানদের শান্ত রাখতে কিংবা খাবার খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। এমনকি শিশু যেন কান্নাকাটি করে বিরক্ত না করে, সে জন্যও ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি অনেক বাবা-মা নিজেরাও মোবাইল আসক্ত। ফলে বাচ্চারাও স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল দেখাকেই তাদের জীবনের একমাত্র অভ্যাসে পরিণত করে নিচ্ছে, যার ফলে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশনের অভাব দেখা দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে শিশুরা কারো বাসায় বেড়াতে গেলেও সবার আগে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড খোঁজে। মানুষের মধ্যে এখন আর আগের মতো সামাজিক ইন্টারঅ্যাকশন বা পারস্পরিক যোগাযোগ হচ্ছে না। এমনকি একই ঘরের ভেতর পাশাপাশি সোফায় বসে থাকার পরও কেউ কারও সাথে কথা না বলে মোবাইলে চ্যাট করছে। এই আচরণটি এখন সমাজের একটি নিয়মিত অভ্যাসের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট অ্যাডিকশন ও বৈশ্বিক মানসিক প্রভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইন্টারনেট আসক্তির এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং এটি এখন সারা বিশ্বজুড়েই একটি বড় সঙ্কট।
সাম্প্রতিক একটি ব্রিটিশ গবেষণায় দেখা গেছে যে, টিনেজ বা কিশোরী বয়সের যেসব মেয়ে বেশি সোশ্যাল মিডিয়া (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) ব্যবহার করে, তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ডিপ্রেসড বা বিষণœতায় ভোগে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ দেয়া তথ্য এবং সমাজসেবা অধিদফতরের প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে অটিজমের সাধারণ হার প্রায় ১৭ জন (বা প্রায় ০.১৭ শতাংশ)। ওই জাতীয় জরিপেই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে উঠে আসে অটিজম আক্রান্তের হার। একইসাথে এ গবেষণাতেই ঢাকার মতো শহরাঞ্চলে এই হার গ্রামীণ এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার শিশুদের মনোবৈজ্ঞানিক সমস্যার ঝুঁকি এবং শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো স্ক্রিন টাইম এবং দেরিতে কথা বলার মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করছে। প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪ মাস বয়সে প্রতি ঘণ্টা অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ৩৬ মাস বয়সে এক্সপ্রেসিভ ল্যাঙ্গুয়েজ ডিলের (মুখে কথা বলার বিলম্ব) ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ১২ মাসের কম বয়সী শিশু যদি দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনের সামনে থাকে, তাহলে তার কথা বলতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা ছয় গুণ বেশি।



