আলজাজিরা
গাজায় যুদ্ধের অবসান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে নতুন একটি সমঝোতা চুক্তিতে সম্মত হয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসসহ কয়েকটি সংগঠন। বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির একটি অনুলিপি আলজাজিরার হাতে এসেছে। এতে গাজায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৪ দিনের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ বা অস্ত্র ব্যবস্থাপনার একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি করা হবে। তবে আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ বলেন, দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার পর বাস্তবসম্মত একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইসরাইল যদি সেনা প্রত্যাহার, পুনর্গঠন কিংবা অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে হামাসও চুক্তির কোনো অংশ কার্যকর করবে না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, গাজায় একটি ন্যাশনাল কমিটি এবং একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স মোতায়েনের মধ্য দিয়ে অস্ত্র ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ন্যাশনাল কমিটি গাজায় থাকা অস্ত্রের তালিকা প্রণয়ন, সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে। পুরো প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠন এতে অংশ নেবে।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হামাস বা অন্য কোনো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর অস্ত্র ইসরাইল কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্র বা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে না। বরং অস্ত্রগুলো গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে যাওয়া ন্যাশনাল কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানান, প্রথমে পুলিশের হাতে থাকা অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা হবে এবং সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধের দিকে অগ্রসর হওয়া হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি “যুগান্তকারী পদক্ষেপ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি দাবি করেন, এ চুক্তির মাধ্যমে গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে, যা তার গঠিত তথাকথিত বোর্ড অব পিসের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে। ট্রাম্পের দাবি, নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হলে ইসরাইল গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করবে এবং সেখানে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সাথে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
যদিও ইসরাইলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবু যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে মিসর, কাতার এবং তুরস্কের মধ্যস্থতায় কায়রোয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘আল-কাহেরা নিউজ’ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে শিগগিরই কায়রোতে নতুন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং ন্যাশনাল কমিটির কার্যক্রম শুরুর প্রস্তাব হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। তবে গাজার আরেক সংগঠন প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) জানিয়েছে, চুক্তির যে খসড়া প্রচারিত হচ্ছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশেষ করে শব্দচয়ন নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক নিদাল আবু জাইদও বলেন, চুক্তিতে ‘নিরস্ত্রীকরণ’ শব্দের পরিবর্তে অস্ত্র ‘তালিকাভুক্ত ও মজুদ’ করার যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। তার মতে, অস্ত্র তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণের কাজ সাধারণত একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধানে হয়, কিন্তু প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ সাধারণত বিজয়ী বা শত্রুপক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। সেই কারণেই ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো সরাসরি নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে অস্ত্র ব্যবস্থাপনার এই পদ্ধতিকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করছে।
গাজায় মুসল্লিদের ওপর ইসরাইলি ড্রোন হামলা
এদিকে গাজার উত্তরাঞ্চলের গাজা সিটিতে খাদিজা মসজিদের পাশে জড়ো হওয়া একদল মানুষের ওপর ড্রোন হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইল। হামলায় অন্তত দু’জন গুরুতর আহত হয়েছেন। খবর আল-জাজিরার।
হামলার পর আহতদের গাজার আল-শিফা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে চিকিৎসাসূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। আল জাজিরার অন্য এক খবরে গাজা সিটির উত্তরের কারামা এলাকাতেও পৃথক একটি ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ইসরাইলি বাহিনী এবং ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে। একই সাথে এদিন হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তার খাল্লাত আল-হুমুস এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। একই সাথে রামাল্লাহর উত্তরে অবস্থিত আতারা গ্রামেও ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার খবর পাওয়া গেছে।



