সৈয়দ জেলওয়ার হোসেন স্বপন গোলাপগঞ্জ (সিলেট)
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে এ দিন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো দেশ। উচ্চ আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কারের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বলপ্রয়োগে সেই আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে ডাক আসে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির। এতে আন্দোলন আরো চরম আকার ধারণ করে। এই সময় বসে থাকেননি সিলেটের গোলাপগঞ্জের ছাত্র-জনতাও। ৩ আগস্ট গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদর ও ঢাকা দক্ষিণ বাজারে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ করতে থাকলে বেধড়কভাবে লাঠিচার্জ শুরু করে পুলিশ-বিজিবি। পরদিন ৪ আগস্ট সকালে ঢাকা দক্ষিণ বাজারে ফের বিক্ষুব্ধরা বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় সাদা নোহা গাড়ির বহরে বিজিবির একটি টহল টিম আন্দোলনকে বাধা দিয়ে লাঠিচার্জ শুরু করে। শুরু হয় গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ বাজারে তীব্র সংঘর্ষ। ওই দিন সকাল থেকে আন্দোলন গুলিবর্ষণ হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে। এতে একই দিন একে একে ছয়জন পুলিশ-বিজিবির গুলিতে প্রাণ হারান। নিহতদের লাশ নিয়ে মিছিল শুরু হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরে।
আজ সেই ৪ আগস্ট। দিনটি গোলাপগঞ্জে এক শোকাবহ দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী সরকারের পুলিশ-বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে এক দিনে নিহত হয়েছেন শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ গোলাপগঞ্জের ছয়জন। আজও নিহতদের পরিবারে কান্না থামেনি। সন্তানহারার বেদনা আর আহাজারিতে তাদের চোখ ভেসে যায়। সন্তান হারানোর বেদনা আজও ভুলতে পারেনি শহীদ পরিবাররা।
গোলাপগঞ্জে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নিহত ছয়জন ছাড়াও ৫ আগস্ট সিলেট শহরের ক্বীন ব্রিজ সংলগ্ন আলী আমজদ ঘড়ির পাশে এবং কোতায়ালি মডেল থানা গেট সংলগ্ন স্থানে পুলিশের গুলিতে গোলাপগঞ্জের আরো একজন প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন- উপজেলার নিশ্চিন্ত গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে মো: নাজমুল ইসলাম, বারকোট গ্রামের মৃত মকবুল আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন, শিলঘাট গ্রামের মো: কয়ছর আহমদের ছেলে সানি আহমদ, রায়গড় গ্রামের ছুরাই মিয়ার ছেলে জয় আহমদ, ঘোষগাঁও গ্রামের মোবারক আলীর ছেলে গৌছ উদ্দিন, দত্তরাইল গ্রামের আলা উদ্দিনের ছেলে মিনহাজ আহমদ ও ঢাকা দক্ষিণ রায়গড় গ্রামের মো: রফিক উদ্দিনের ছেলে মো: পাবেল আহমদ কামরুল।
স্থানীয় ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা, কারফিউ ভঙ্গ করে প্রতিদিনের মতো ৪ আগস্ট সকাল থেকে উপজেলা সদর, ঢাকা দক্ষিণ বাজার, ভাদেশ্বরসহ বড় বড় বাজারে আন্দোলনের জন্য অবস্থান নেয়। ৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ বাজারে বিজিবির একটি টহল টিম সাদা নোহা নিয়ে টহল দেয়ার সময় আন্দোলনকে বাধা দেয়। এতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতা। হামলা চালায় বিজিবির ব্যবহৃত নোহা গাড়িতে। আত্মরক্ষার্থে বিজিবি রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে ঢাকা দক্ষিণ বাজারে। পরে বিজিবি-পুলিশ আন্দোলনে রাবার বুলেটের পাশাপাশি স্প্রিং বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। শতশত ছাত্র-জনতা আহত হতে থাকে। এতে করে ছাত্রদের আন্দোলনে এলাকার মানুষজন ও অভিভাবকরা জড়িয়ে পড়ে পুলিশ-বিজিবি ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের ধাওয়া করতে শুরু করেন। তীব্র হয়ে ওঠে ঢাকা দক্ষিণ বাজারের আন্দোলন। পাল্টা ধাওয়া ও গুলি ছুড়তে থাকে বিজিবি। এতে শতাধিক ছাত্র-জনতাকে আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে স্থানীয়রা ঘেরাও করে ফেলে ঢাকা দক্ষিণ বাজারে বিজিবি ও পুলিশকে। বিজিবি পালিয়ে গোলাপগঞ্জের দিকে আসার সময় বারকোট ও ধারাবহর এলাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে স্থানীয় জনতা ব্যারিকেড দিয়ে এলাকার মসজিদে মাইকিং করতে থাকলে স্থানীয়রা সিলেট-ঢাকা দক্ষিণ সড়ক বন্ধ করে পুলিশ-বিজিবিকে ঘেরাও করে ফেলে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে ও আত্মরক্ষার্থে সরাসরি গুলি নিক্ষেপ করতে থাকে বিজিবি। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন উপজেলার বারকোট গ্রামের মৃত মো: মকবুল আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন, নিশ্চিন্ত গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে নাজমুল ইসলাম ও শিলঘাট পশ্চিমপাড়া গ্রামের কয়ছর আহমদের ছেলে সানি আহমদ। গুরুতর আহত হন ঢাকা দক্ষিণ লেচুবাগান গ্রামের সুরাই মিয়ার ছেলে জয় আহমদসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় জয় আহমদকে সিলেট বেসরকারি হাসপাতাল ইবনে সিনায় ভর্তি করার কিছুক্ষণ পরেই সেও মারা যায়।
উপজেলার বারকোট এলাকায় তিনজন ঘটনাস্থলে নিহত ও সিলেটে হাসপাতালে নেয়ার পর আরো একজন নিহত হওয়ার বিষয়টি চার দিকে চাউর হলে গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদর আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজিবি-পুলিশ গুলি ছুড়ে ছুড়ে আত্মরক্ষার্থে গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদে আশ্রয় নেয়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরোধ করে রাখার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দিকে উপজেলা হাসপাতালের সামনে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন এবং ওই ঘটনাস্থলের আরো একজন সিলেট বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। চার দিকে চারজন মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদর আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা গোলাপগঞ্জ মডেল থানা ঘেরাওসহ মিছিল শুরু করে। এ সময় তাদের পুলিশ-বিজিবির গুলিতে উপজেলা সদর ও গোলাপগঞ্জ মডেল থানার পাশে ইসলাম প্লাজার সম্মুখে নিহত হন উত্তর ঘোষগাঁও গ্রামের মোবারক আলীর ছেলে গৌছ উদ্দিন ও একই সময় উপজেলা সদরের কদমগাছের তলা পয়েন্ট সংলগ্ন সানরাইজ পার্টি সেন্টার ও রেস্টুরেন্টের বিপরীত পাশে নিহত হন পশ্চিম দত্তরাইল গ্রামের মো: আলাউদ্দিনের ছেলে মিনহাজ আহমদ।
এ দিকে ঘটনার দুই বছর হলেও দৃশ্যমান কোনো আসামি পুলিশ এখনো আটক করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের দোসররা প্রকাশ্যে উপজেলা সদরে চলাচল করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ। এ দিকে গোলাপগঞ্জ থানা ও আদালতে মামলা করা হলেও মডেল থানার ওসির রহস্যজনক ভূমিকায় আজও দৃশ্যমান কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। এ নিয়ে গোলাপগঞ্জবাসী ক্ষুব্ধ।



