পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ের অনন্য মাইলফলক

যানবাহন পারাপার ২ কোটি ৩৪ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম

Printed Edition

লৌহজং(মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার পদ্মার বুক মাড়িয়ে চলতে থাকা যানবাহনগুলো থেকে দিন দিন বাড়ছে পদ্মা সেতুর টোল আয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পদ্মা সেতু টোল আদায়ের ক্ষেত্রে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উদ্বোধনের পর থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সেতুটি থেকে সংগৃহীত মোট টোলের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পদ্মা সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের অর্থনীতির এক প্রাণপ্রবাহ। গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মাসুদ রানা শিকদারের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।

সেতুুু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পর থেকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিতকারী এই সেতুটি দিয়ে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা এবং রাজস্ব আদায় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেতুটি চালুর ফলে যাতায়াতের সময় সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং শিল্পজাত পণ্য পরিবহনে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

সেতু কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে (মাওয়া ও জাজিরা) স্থাপিত অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি পদ্ধতি টোল আদায় কার্যক্রমকে বেগবান করে। এতে যানবাহনকে টোল প্লাজায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না, ফলে সময় বাঁচে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) কার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের ফলে যাতায়াত আরো দ্রুত ও সহজতর হয়েছে। জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা এবং ডিজিটাল টোল সিস্টেমের আধুনিকায়নের ফলেই এই সাফল্য দ্রুত অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে গতকাল বিকেলে জানান, সেতু চালুর পর এ পর্যন্ত মাওয়া-জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে দুই কোটি ৩৪ লাখ ১৬ হাজার দুই শ’ ৪১টি। আর সর্বমোট (ক্যাশ, ক্রেডিট ও ইটিসিএসসহ) টোল আদায় হয়েছে তিন হাজার এক কোটি ৭৫ লাখ ছয় হাজার ১৫০ টাকা। এর মধ্যে ইটিসিএস থেকে আয় হয়েছে দুই কোটি ৫৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯ শ’ টাকা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সেতু চালুর পরদিন থেকে গেল বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত গত সাড়ে তিন বছরে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমসহ সেতুর উভয় প্রান্ত মিলে সর্বমোট টোল আদায় হয় দুই হাজার ৯৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। আর এতে করে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছিল দুই কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫টি। সেতু চালুর প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন পার হয় এবং টোল আদায় হয় মোট ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ টাকা। দ্বিতীয় বছরে ২০২৩ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৮ লাখ এক হাজার ৩৭৪টি এবং মোট টোল আদায় হয়েছে ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫০ টাকা টোল আদায়ে সক্ষম হয় পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ। সেতু চালুর তৃতীয় বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত এক বছরে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি। এ সময় রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ দুই হাজার ৫৫০ টাকা। এতে করে ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন থেকে গেল বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত সেতুর প্রথম তিন বছরে মাওয়া ও জাজিরা উভয় প্রান্তের টোল প্লাজায় সর্বমোট টোল আদায় হয়েছিল দুই হাজার ৫০৭ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ টাকা।

প্রসঙ্গত ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে চালু হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দেশের অন্যতম বৃহৎ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সঙ্কোচননীতি অবলম্বন করে সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধের শিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তি করে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে সুদাসল পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেতুটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।