বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পাক্ষিক প্রধান অর্থনৈতিক সূচক (১৬-৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫) প্রকাশের পর স্পষ্ট হয়েছে- সরকার যতই স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে, অর্থনীতির ভেতরে একাধিক গভীর ফাটল দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। মুদ্রানীতি কঠোর, ঋণপ্রবাহ শ্লথ, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হাতছাড়া, বাণিজ্যঘাটতি বাড়ছে, আর মুদ্রাস্ফীতি কমার বদলে থমকে আছে উচ্চ মাত্রায়।
অন্য দিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও এ দুই সূচক দিয়ে পুরো অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব- এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
মুদ্রা সরবরাহ : বাহ্যিক স্বস্তি, অভ্যন্তরীণ চাপ : ব্রড মানি প্রবৃদ্ধি ৮.১৪%; কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির প্রাণশক্তি বাড়ানোর বদলে মূলত সরকারি ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপে সৃষ্ট কাগুজে সম্প্রসারণ। ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধি ৯.৯৭%; কিন্তু বিনিয়োগে ব্যবহারযোগ্য অর্থের ঘাটতি কমেনি- কারণ তারল্য বাজার এখনো সঙ্কুুচিত। রিজার্ভ মানি মাত্র ৩.৪৪% বেড়েছে, যা খুবই সীমিত। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত তারল্য না থাকলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধীরগতির ঝুঁকিতে থাকে- ঠিক সেটিই এখন ঘটছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণ : সরকারি খাত ফেঁপে উঠছে, বেসরকারি খাত রক্তশূন্য : অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধি ১০.২০%; কিন্তু এর প্রায় পুরোটা সরকারের দিক থেকে এসেছে।
* সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২৪.৪৫%- অস্বাভাবিক মাত্রার ঋণনির্ভরতা।
* বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.২৯%- যা নতুন বিনিয়োগ স্থবিরতার কঠোর সঙ্কেত।
সরকারি ব্যয় সামলাতে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে সরকারি খাতে ঋণের পাহাড় জমছে। ব্যতিক্রম শুধু একটি সূচক- জুলাই- সেপ্টেম্বর সময়ে নিট সরকারি ব্যাংকঋণ দুই হাজার ৫৪০ কোটি টাকা কমেছে; কিন্তু এটি ঋণচাপ কমার নয়; বরং বিলম্বিত ব্যয়ের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
সুদের কাঠামো : নীতি হার স্থির; কিন্তু বাজারে শ্বাসরোধ : বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট ১০%-এ স্থির রেখে কড়া অবস্থান বজায় রাখছে। কিন্তু বাস্তবে কলমানি রেট ৯.৯৭%- যা ইঙ্গিত দিচ্ছে বাজারে কার্যত তারল্য নেই। সুদের এই চাপ নতুন উদ্যোক্তা, শিল্প ও এসএমই খাতের জন্য ‘বৃদ্ধিহন্তা’ নীতি হিসেবে কাজ করছে।
রাজস্ব খাতে অর্ধসাফল্য : লক্ষ্য মিস, চাপ অব্যাহত : জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কর রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে ৯১ হাজার পাঁচ কোটি টাকা- প্রবৃদ্ধি ভালো, ২০.৪৫%; কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে মাত্র ৯১.০৯%- অর্থাৎ সরকারের ব্যয় কাভার করার মতো রাজস্বপ্রবাহ এখনো দুর্বল। কর আদায় বাড়ার পরও সরকারি ব্যয়ের চাপ- বিশেষ করে সুদ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিজনিত খরচ- রাজস্ব ঘাটতিকে স্থায়ী চরিত্র দিচ্ছে।
রফতানি-আমদানি ও বাণিজ্যঘাটতি : বিপর্যয়ের পূর্বাভাস : রফতানি বেড়েছে ৫.২৬%; কিন্তু আমদানি বেড়েছে ৯.৪৯%- অর্থাৎ বাণিজ্যঘাটতি বাড়ছে উদ্বেগজনক গতিতে। এমন সময়ে যখন বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি শক্ত করতে হতো, তখন আমদানি শিথিলতার ফলে বাজারে চাপ বাড়ছে। রফতানি আয় এখনো তৈরী পোশাকনির্ভর (৮০.৮৮%)- যে নির্ভরতা বৈচিত্র্যহীন অর্থনীতির বড় দুর্বলতা।
রেমিট্যান্স : ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি; কিন্তু গতি কমছে : রেমিট্যান্স ১৫.৯৫% বেড়েছে- যা ভালো খবর। কিন্তু আগের বছর প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৩%- মানে খুব দ্রুত গতিতে মন্থরতা আসছে। অর্থনীতির এ পর্যায়ে রেমিট্যান্সের ওপর অতিনির্ভরতা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রিজার্ভ : সংখ্যায় উজ্জ্বল, বাস্তবে সীমাবদ্ধতা : রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.৪৩ বিলিয়ন ডলার, গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো-
* আইএমএফ-এর বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আরো কম।
* রফতানি-আমদানি ব্যবধান বাড়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ এখনকার রিজার্ভ উন্নতি ‘স্থিতিশীলতার সূচনা’ হলেও ‘দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা’ নয়।
চলতি হিসাবঘাটতি : অর্থনীতির গভীর ক্ষতের পরিচয় : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই চলতি হিসাবে ঘাটতি ৪৮ কোটি ডলার- যেখানে গত বছর ছিল সামান্য উদ্বৃত্ত। বাণিজ্যঘাটতি বাড়া, আমদানির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ উপকরণে ব্যয় বাড়ার কারণে এই ঘাটতি আগামী মাসগুলোতে আরো বাড়তে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি : কমার কথা ছিল; বরং স্থির উচ্চতায় : মুদ্রাস্ফীতি ৮.৩৬%- আগস্টের তুলনায় সামান্য বেড়েছে। সারা বছরের গড় মুদ্রাস্ফীতি কমলেও সাম্প্রতিক পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে- খাদ্যদ্রব্যে চাপ বাড়ছে; উৎপাদন ব্যয় কমছে না; বাজারে নৈতিক সুশাসন এখনো দুর্বল। সার্বিক বিবেচনায় অর্থনীতি এখন ‘মেরামতের পর্যায়ে’, কিন্তু ঝুঁকি অক্ষত। অর্থনীতি এখন একধরনের সঙ্কীর্ণ সেতুতে দাঁড়িয়ে- এক দিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের স্বস্তি, অন্য দিকে বিনিয়োগ সঙ্কোচন, বাণিজ্যঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্বঘাটতির লাল সতর্কতা।
কড়া মুদ্রানীতি দিয়ে কেবল মুদ্রাস্ফীতি ও তারল্যসঙ্কোচন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব- কিন্তু বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া স্থায়ী স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। অর্থনীতি এখন যেন জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করানো একটি কাঠামো- যা টিকে থাকতে পারে, আবার ভুল পদক্ষেপে ধসে পড়ার ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না।



