বিশেষ সংবাদদাতা
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন রেহেনাসহ তাদের পরিবারের সদস্য এবং আলোচিত ১০টি শিল্প গ্রুপের দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই সাথে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের (এসটিআর/এসএআর) রিপোর্টিং আগের বছরের তুলনায় ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে, যার ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যৌথ তদন্তের আওতায় শেখ হাসিনা পরিবার এবং ১০টি শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, কর ফাঁকি ও অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে দেশে থাকা প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার এবং বিদেশে থাকা আরো প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, “দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি জানাতে পারব।”
এক প্রশ্নের জবাবে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেয়া হয় না। তিনি বলেন, “আমরা দলমতের দিকে তাকাই না। সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়। যে কেউ জড়িত থাকলেই তার বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
বিএফআইইউর তথ্য মতে, তদন্তের আওতায় থাকা শিল্প গ্রুপগুলো হলো- এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ব্যাংকগুলো থেকে সময়ে সময়ে নানা অজুহাতে চাঁদা তুলে শেখ হাসিনাকে সরবরাহ করতেন এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার প্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, ডা: ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের আরামিট গ্রুপ।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিএফআইইউ প্রধান জানান, তদন্তের ভিত্তিতে সম্পদ জব্দের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলা দায়ের, বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ দিকে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সন্দেহজনক লেনদেনের নজরদারিতেও বড় ধরনের বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। অর্থাৎ এক বছরে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৮৫৪টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে, যা ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
মোট প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (এসএআর)। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি প্রতিবেদন জমা পড়েছিল, সেখানে চার বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা প্রায় ছয় গুণে উন্নীত হয়েছে। তবে একই সময়ে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন বা ক্যাশ ট্রানজ্যাকশন রিপোর্ট (সিটিআর) কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট সিটিআর জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৪৫৪টি, যা আগের অর্থবছরের ২৩ হাজার ৯০০টির তুলনায় ৪ হাজার ৪৪৬টি বা ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ কম। বর্তমানে কোনো হিসাবে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে তা সিটিআর হিসেবে বিএফআইইউতে রিপোর্ট করতে হয়।
সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনভাবে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাঠাচ্ছে। আগে রাজনৈতিক চাপ বা ভয়ের কারণে অনেক তথ্য রিপোর্ট করা হতো না। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলেই রিপোর্টিংয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিলে ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে এগিয়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৯৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। সবশেষ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো একাই ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৯৯১টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের রিপোর্টিং প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১২ হাজার ৮০৯টি প্রতিবেদনের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।
বিএফআইইউর মতে, কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন জুয়া, বাজি, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ ব্যবহার এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক কার্যক্রমের ওপর নজরদারি আরো জোরদার করায় সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের হার বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রিপোর্টিংয়েও উন্নতি হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেয়া সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা ১২১টি থেকে বেড়ে ২৫০টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে অর্থ প্রেরণকারী (মানি ট্রান্সফার) প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে এক হাজার ৯৫টিতে উন্নীত হয়েছে। তবে মোট প্রতিবেদনের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অংশ যথাক্রমে প্রায় এক শতাংশ ও চার শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন তদন্ত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে মোট ১ হাজার ৩১৪টি তথ্য বিনিময় করেছে বিএফআইইউ। এর মধ্যে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, বিশেষ করে সিআইডি, ৬৫৭টি তথ্য নিয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের অন্যান্য সংস্থাও প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলার অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাজ্যে। দেশটি এই অর্থ আটক করে বাংলাদেশের কাছে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চায়। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা। যথা সময়ে তা আটকাতে না পারায় পরে তা সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যায় বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে বিএফআইইউ প্রধান কোনো উত্তর দেননি।



