নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- মৃত্যুদণ্ড আইন ঘিরে বিক্ষোভ সঙ্ঘাত ও মানবিক সঙ্কট
- ঔপনিবেশিক নীতি ও সহিংসতার ভূমিকায় ইসরাইল নীরব বিশ্ব সম্প্রদায়
- জেরুসালেমে নিজ বাড়ি ভাঙতে বাধ্য করল ইসরাইল
গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-মাওয়াসি শিবিরে এখন এক ফোঁটা নিরাপদ পানির জন্য চলছে নিরন্তর যুদ্ধ। দীর্ঘ দুই বছর আগে রাফাহ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা সাত সন্তানের জনক নওয়াফ আল-আখরাস প্রতিদিন ভোরে তার বড় ছেলেকে নিয়ে বের হন পানির খোঁজে। তাঁবু থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি ওয়াটার ফিলিং স্টেশনে পৌঁছাতে তাদের পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ, আর সেখানে গিয়ে দেখা মেলে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। প্রচণ্ড রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই জেরিক্যান পানি জোটাতে পারেন নওয়াফ, যা তার পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় সামান্যই। আলজাজিরা জানায়, ইসরাইলের নির্বিচার হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য এই দৈনন্দিন সংগ্রাম এখন এক ভয়াবহ যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। গাজার বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি পানিসঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে ‘এতা’ নামের একটি পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায়। অর্থায়নের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি পানি সরবরাহ বন্ধ করায় আগে যে পানির ট্রাকগুলো তাঁবুর কাছাকাছি আসত, সেগুলো এখন আর আসছে না।
নওয়াফ আল-আখরাস আক্ষেপ করে বলেন, এর আগে তারা ক্ষুধার জ্বালায় মৃতপ্রায় ছিলেন, আর এখন তাদের তৃষ্ণার্ত রেখে মৃত্যুর পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। সামনে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ ধেয়ে আসায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। পানির অভাবে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার লোনা ও দূষিত পানি ব্যবহার করছে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত শনিবার আল-মাওয়াসিতে কয়েকশ’ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই সঙ্কট নিরসনের আহ্বান জানান। বিক্ষোভকারীরা জানান, পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রবেশে ইসরাইলি বাধা এবং জ্বালানিসঙ্কটের কারণে পানির পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। একসময় জনবিরল এই কৃষিনির্ভর এলাকাটি এখন গাজার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যেখানে অবকাঠামোর চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে যে, গাজায় বর্তমানে পানির প্রাপ্যতা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে ৯৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং সরবরাহ বন্ধ করে পানিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা, যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে ।
মৃত্যুদণ্ড আইন ঘিরে বিক্ষোভ, সঙ্ঘাত ও মানবিক সঙ্কট
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে ‘সন্ত্রাসবাদে’ অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন পাসের পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব, মিসর, জর্দান ও তুরস্কসহ আটটি দেশ এই আইনকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে ‘পিছিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ’ বলেছে, আর জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টার্ক সতর্ক করেছেন- দখলকৃত অঞ্চলে এই আইন প্রয়োগ করা হলে তা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়, আইনটির প্রতিবাদে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। রামাল্লাহ, নাবলুস, হেবরনসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নেমে আসে ফিলিস্তিনিরা। সিরিয়ার দামেস্ক, হামা ও দেরাতেও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদ এক মাসের বেশি সময় ধরে মুসল্লিদের জন্য বন্ধ রয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিরা পুরনো শহরের বাইরে রাস্তায় জুমার নামাজ আদায় করছেন। একই সাথে খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থান চার্চ অব দ্য হলি সেপালকারও ‘হলি উইক’-এ বন্ধ রাখা হয়েছে, যা উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। হামাস জানিয়েছে, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করবে না। এর মধ্যেই ইসরাইলি হামলায় গত কয়েক দিনে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি ঘটছে। জ্বালানি সঙ্কটে হাসপাতালের জরুরি সেবা হুমকির মুখে পড়েছে। এক মিলিয়নের বেশি মানুষ এখনো তাঁবুতে বসবাস করছে, আর অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকি ও রোগব্যাধির আশঙ্কা বাড়ছে। পশ্চিমতীরেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। নাবলুস ও রামাল্লাহ এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, অগ্নিসংযোগ ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা হামলাকারীদের বাধা না দিয়ে উল্টো সহায়তা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, মৃত্যুদণ্ড আইন, চলমান সামরিক অভিযান ও মানবিক সঙ্কট- সবমিলিয়ে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ঔপনিবেশিক নীতি ও সহিংসতার ভূমিকায় ইসরাইল,নীরব বিশ্ব সম্প্রদায়
গাজায় চলমান যুদ্ধ ও পশ্চিমতীরে নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দমননীতি ও জাতিগত নির্মূলের অভিযোগ আবারো জোরালো হয়েছে। বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে আইন প্রণয়ন; সব ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের ওপর কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নিহত শিশুদের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি ইসরাইলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া একটি আইন অনুযায়ী, ইসরাইলিদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে। অনেকের দাবি, এই আইন বৈষম্যমূলক এবং এটি কেবল ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম বলেছে, এই আইন কার্যকর হলে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হবে। এ দিকে ইসরাইলি কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়, যা ন্যায়বিচারের মানদণ্ডের সাথে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সীমিত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা নিন্দা জানালেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় সামরিক হামলা ও পশ্চিমতীরে কঠোর আইন প্রয়োগ- দুই ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ বাড়ছে। এতে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেরুসালেমে নিজ বাড়ি ভাঙতে বাধ্য করল ইসরাইল
পূর্ব জেরুসালেমের সিলওয়ান এলাকায় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ দুই ফিলিস্তিনি ভাইকে নিজ হাতে নিজেদের বাড়ি ভেঙে ফেলতে বাধ্য করেছে। মঙ্গলবার জেরুসালেম গভর্নরেট জানায়, নাদের ও হাতেম বায়দুন নামে দুই ভাই আল-বুস্তান এলাকায় তাদের প্রায় ৮৮ বর্গমিটারের দু’টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেন। ১৯৯৮ সাল থেকে থাকা এই বাড়িগুলোতে ১০ জন বসবাস করতেন, যারা এখন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্মাণ অনুমতি সীমিত রেখে ইসরাইল বসতি সম্প্রসারণ বাড়াচ্ছে। সিলওয়ান এলাকা দীর্ঘ দিন ধরে উচ্ছেদ ও বাড়িঘর ধ্বংসের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
গাজায় নিহত বেড়ে ৭২,৩১২
গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৩১২ জনে পৌঁছেছে বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ১৩৪ জনে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও প্রতিদিনই হামলার ঘটনা ঘটছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে আছে এবং উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৩৩ জন নিহত ও দুই হাজার ৩৪ জন আহত হয়েছেন। দুই বছরের এই যুদ্ধে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ।



