মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ
ফররুখের জন্ম পরাধীনতার শেকলে বাঁধা ব্রিটিশের শাসনকালে। ছোটবেলা থেকে আব্বা-ভাইয়া-দাদীর কাছে শুনেছেন ব্রিটিশ বেনিয়াদের অত্যাচারের হাজার কাহিনী। শোষণের নানা কথা। বিশ্বব্যাপী পর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অনেক কাহিনী ফররুখ পড়েন বিভিন্ন পুস্তক, পত্র-পত্রিকায়। পুঁজিবাদের শোষণ ও অন্ন বস্ত্রহীন মানুষের করুণ অবস্থা দেখে তার মন খুব খারাপ হয়ে পড়ে। তিনি মানুষের মুক্তির উপায় নিয়ে চিন্তা করেন মাঝে মাঝে।
কলেজ জীবনের প্রথম লগ্নে কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জনের সাথে সাথে ফররুখের বেশ কিছু বন্ধু জুটে যায়। যাদের অধিকাংশ ছিল তথাকথিত বামপন্থী প্রগতিবাদী কমিউনিজমের অনুসারী বলে পরিচিত।
তারা ফররুখের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার কথা জানতে পারে। মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে তারা ফররুখের কাছে সমাজতান্ত্রিক কমিউনিজম আদর্শ উপস্থাপন করে। তাকে পড়তে দেয় মানবতাবাদী রূপে পরিচিত কমরেড এম এন রায়ের বইপত্র। কার্ল মার্কস-লেনিনের পুস্তক-পুস্তিকা। যার মূল আবেদন- মানুষের দুঃখ-দুর্দশার একমাত্র কারণ ধর্মীয়, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ। মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। ধর্মের আবেগপূর্ণ হাতিয়ার দিয়ে মানুষকে শোষণ করে মোল্লা-ব্রাহ্মণ-পুরোহিত। এ সমাজে সবার উপরে মানুষ সত্য। তাই কে খোদা, কে ঈশ্বর, কে গড-এর অনুসারী সে কথা বড় নয়; মানুষের মুক্তিই একমাত্র ধর্ম, একমাত্র মানবতা। যে ধর্মের লেবাস ঝেড়ে ফেলে মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারবে সে-ই এ পৃথিবীর সেরা মানুষ। অস্তিত্বহীন অবাস্তব স্রষ্টার অন্ধ অনুসারী হয়ে বোকা বনার কোনো মানে নেই। তাতে মানুষ গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয়।
কমিউনিস্টদের এ সুন্দর (!) বচন তরুণ ফররুখের মাথা গুলিয়ে দেয়। তিনি যে মানুষের মুক্তির পথ খুঁজে বেড়াচ্ছেন যেন এখানেই তা পাওয়া যাবে। এম এন রায়ের ‘মৌলিক মানবতন্ত্রে (জধফরপধষ ঐঁসধহরংঃ) উদ্বুদ্ধ হন ফররুখ। কয়েকজন বামপন্থী কমিউনিস্ট সাহিত্যিক বন্ধুর সংস্পর্শে এসে ক্রমেই ফররুখ নাস্তিকতার পথে ধাবিত হন।
সমাজের শোষকশ্রেণী, সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীদের খপ্পর থেকে মানুষের মুক্তির জন্য ফররুখ অবিরাম গতিতে কলম শাণাতে থাকেন। তিনি লিখেন-
ঐ দেখ শিশু কাঁদে, ঐ শোনো দিকে দিকে মৃত্যুর খবর
চিরদিন বয়ে মরে, ধরণীর সুপ্ত শিশু নিরাশার স্তর,
ওরা জাগে চিরদিন ব্যথাতুর, ঘুম হারা রাত্রির প্রহর
পেষণের মর্মান্তিক কালো চাপ রচিতেছে ওদের কবর,
কল কারখানা গর্ভে আঁকড়িয়া প্রতিদিন ধনীর শহর
মাঠে মাঠে, শস্যক্ষেতে, জলে স্থলে, রচিতেছে ওদের কবর।
(পরিপ্রেক্ষিত : হে বন্য স্বপ্নেরা)
পূর্ব ইউরোপে, চীনে, কোরিয়ায়, কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কবিমনকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করে। তিনিও বৃহৎ বাংলা তথা ভারতবর্ষে ওই ধরনের বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি এ সময় রচনা করেন তার ঐতিহাসিক কবিতা ‘ইনকিলাব’-
দিনমজুরের রক্তে ধনিক গড়ছে মাণিক ‘লা’লে নাব;
সেই জুলুমে কিষাণ চাষির শ্রমের ফসল হয় খারাব
ইনকিলাব...আয় ইনকিলাব...
তাসবির দানায় রাখলো ঘিরে মুফতি ঈমানদারের প্রাণ,
পৈতাধারী বামুন রাখে কাফির জনে লা-জাওয়াব
ইনকিলাব... আয় ইনকিলাব...
আমির ধনিক খেলছে জুয়া, দাবার ঘুঁটি মিথ্যাময়,
কণ্ঠাগত প্রাণ জুলুমে; গোলাম তবু দেখছে খাব
ইনকিলাব... আয় ইনকিলাব...
ফররুখ তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কবি আল্লামা ইকবালের ‘খোদার ফরমান’ কবিতাতেও মজলুম মানুষের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি কবিতাটির যে নিপুণ অনুবাদ করেছেন তাকে কখনো অন্যের লেখা কবিতা মনে হয় না। যেমন-
ওঠো, দুনিয়ার গরিব ভুখারে জাগিয়া দাও।
ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও॥
কর ঈমানের আগুনে তপ্ত গোলামি খুন,
বাজের সমুখে চটকের ভয় ভাঙিয়ে দাও।
ঐ দেখো আসে দুর্গত দীন দুখীর রাজ;
পাপের চিহ্ন মুছে যাও, ধরা রাঙিয়ে দাও।
কিষাণ মজুর পায় না যে মাঠে শ্রমের ফল,
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও॥
স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে কেন আড়াল?
মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও॥
ফররুখ কী লিখেছেন সে কথা নিয়ে পরিবারের মাথাব্যথা নেই। তারা বোঝেন, সে কবি হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তার বেহিসেবি চাল-চলন, কমিউনিস্ট সংসর্গ এবং ধর্মবিরোধী কথাবার্তায় সবাই শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তার সম্বন্ধে প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা করে নানা কানাঘুষা।
ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারের সন্তান ফররুখের দেহের প্রতিটি অণু-পরামাণুতে পূর্বপুরুষের রক্তধারা প্রবাহিত। কমিউনিস্ট সাহিত্যের পরতে পরতে ঘুরে ফররুখ বুঝতে পারেন- তিনি ক্রমেই মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর করুণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। বন্ধুরা বলছে, ঐ অশরীরি বস্তুর (!) ধারণা অন্তর থেকে মুছে ফেল। ফররুখের পবিত্র আত্মায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোলা লাগে। তিনি চিন্তাসাগরে সাঁতরাতে থাকেন। কিন্তু শোষিত বঞ্চিত ক্ষুধিত মানুষের মুক্তির জন্য সাম্যবাদ ছাড়া আর কোনো ভালো আদর্শ পথ খুঁজে পান না।
মানবদরদি ফররুখ দিন দিন অজানা আবেশে উন্মনা হয়ে ওঠেন। নির্যাতিত মানুষের অসহায় কান্না তার হৃদয়ে বারবার গুমরে ওঠে। এ সংসার, পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব সবকিছু তার কাছে অরুচি ঠেকে। তিনি বেরিয়ে পড়েন মহাসত্যের সন্ধানে।
আশা-নিরাশার দোদুল দোলায় দুলতে থাকে ফররুখের কবিমন। এ সময় হঠাৎ একদিন ফররুখের সাক্ষাৎ ঘটে এক মহান পুরুষের সাথে। তিনি হলেন অধ্যাপক মাওলানা আবদুল খালেক। আধ্যাত্মিক জগতের সুবিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক। টেইলর হোস্টেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ছতুরা নিবাসী অধ্যাপক আবদুল খালেক ছিলেন ইংরেজি ও আরবিতে এমএ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। সংযুক্ত বাংলা-আসাম কামিল পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার জন্য পেয়েছিলেন গোল্ড মেডেল।
এত বড় শিক্ষিত মহান পুরুষটি ছিলেন মাটির মানুষ। পরাধীন ভারতে ইংরেজ-শিখবিরোধী ইসলামী জিহাদে বালাকোটে শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভির আদর্শ-অনুসারী, ফুরফুরা শরিফের পীর মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকি রাহ: সাহেবের মুরিদ ও খলিফা। আল-কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে লিখিত দু’খণ্ডে সমাপ্ত রাসূল সা:-এর জীবনী ‘সাইয়েদুল মুরসালিন’ ও অন্য গ্রন্থ ‘সিরাজুস সালেকিন’ অধ্যাপক আবদুল খালেকের অমর সৃষ্টি।
একদিন টেইলর হোস্টেল অফিসে আবদুল খালেক সাহেবের সামনে এসে বসলেন কবি ফররুখ। আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ধন্য প্রফেসর সাহেব অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাকালেন ফররুখের পানে। তার অন্তর স্নেহের উচ্ছলতায় ভরে গেল। সৌম্য-সুন্দর প্রাণবন্ত যুবক ফররুখের জন্য তার বড়ই মায়া হলো। তিনি দেখতে পেলেন, ‘নবীন কবির অন্তরে সোনালি সূর্য প্রদীপ্ত হয়ে জ্বলছে, অথচ অসৎ সঙ্গে থেকে খোদাদ্রোহি মতবাদ তাকে মৃত্যুকূপে তাড়িয়ে নিচ্ছে।’
ুপণ্ডিত প্রফেসর স্নেহের পরশ মিশিয়ে ফররুখের কাছে জানতে চান তার নাম-ধাম, লেখাপড়া, আব্বা-আম্মার কথা। জানতে চান শারীরিক, মানসিক অবস্থা। নতুন লেখা চলছে কেমন, তা।
প্রশ্নোত্তরের মাঝে ফররুখ একটু সহজ হয়ে উঠেছেন লক্ষ করে প্রফেসর সাহেব তার কাছে মানুষের সার্বিক মুক্তি বিধান কী- তা জানতে চান।
ফররুখ বললেন, ‘মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির একমাত্র পথ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ।’
দ্বিমত পোষণ করে প্রফেসর সাহেব বললেন, ‘না, তা কখনো হতে পারে না। মানুষের সার্বিক মুক্তির একমাত্র পথ আল-ইসলাম।’
একরোখা ফররুখ কিছুতেই তা মেনে নিতে পারেন না। কমিউনিস্টদের শেখানো বুলিতে, কমিউনিস্ট সাহিত্যের বাছা বাছা উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বললেন, ‘কমিউনিজম তথা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণীর খতম ছাড়া বঞ্চিত মানুষের মুক্তি নেই।’
অসম এ যুক্তি-তর্ক পরপর তিন দিন চলে। বুদ্ধিমান প্রফেসর মনোযোগের সাথে ফররুখের সব কথা শোনেন। এক সময় ফররুখের যুক্তি-তর্কের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসে।
এবার মুখ খোলেন প্রফেসর সাহেব। আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সহজ সরল যুক্তিতে ফররুখের উদ্দেশে তিনি বললেন- মানুষকে আল্লাহ এ পৃথিবীতে তার খলিফা বা প্রতিনিধিরূপে পাঠিয়েছেন। সম্মান দিয়েছেন সৃষ্টির সব জীব-জন্তুর উপর। পথ-প্রদর্শন করেছেন ভালো ও মন্দের। একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে তুমি, আমি তথা প্রত্যেকটি মানুষকে ফিরে যেতে হবে তার প্রভুর কাছে। কেউ ইচ্ছে করেও এ পৃথিবীতে এক মুহূর্ত বেশি থাকতে পারবে না। কিয়ামতের শেষে চূড়ান্ত বিচার দিনে বিশ্ব প্রভু প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা ভাবে মৃত্যুপূর্ব জীবনের কথা ও কাজের তিল তিল হিসাব নেবেন। ভালো কাজের জন্য পুরস্কারস্বরূপ দান করবেন অনন্ত সুখের জান্নাত। আর মন্দের শাস্তিস্বরূপ ছুড়ে ফেলবেন কঠিন কঠোর জাহান্নামে।
মানবতা যেখানে বিপন্ন, মানুষ যেখানে আল্লাহর আইনে অবিশ্বাসী হয়ে খোদাদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়, তখন সেখানে দিকভ্রান্ত মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ প্রেরণ করেন নবী-রাসূলদের।
জাহেলিয়াতের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কলহপ্রিয়, চরিত্রহীন, দুর্ধর্ষ আরব বেদুইনরা ইসলামের স্বর্ণ ছোঁয়ায় পরিণত হলো এক একজন সোনার মানুষরূপে। তারাই সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ এক আদর্শ জাতিতে পরিণত হলো। জীবন বাজি রেখে পৃথিবীর দেশে দেশে উড়ালো ইসলামের বিজয় পতাকা। অধিকার হারা মানুষকে ফিরিয়ে দিলো তাদের ন্যায্য পাওনা। চারদিকে অবসান হলো শোষণ ও বঞ্চনার। প্রতিদানে মহান আল্লাহ তাদের হাতে অর্পণ করলেন বিশ্ব নেতৃত্ব। তাদের ইহ ও পরকালীন জীবনকে করলেন মঙ্গলময়। নব দীক্ষিত মুসলমানরা পৃথিবীকে সাজাল জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন রূপে। সভ্যতার সৌধ নির্মাণ করল পৃথিবীর শহর-নগর-বন্দরে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পরও শত শত বছর মুসলিম শাসকরা সুশাসন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে জগৎবাসীকে শান্তি ও সুখ দিয়ে গিয়েছেন।
পক্ষান্তরে আমরা কী দেখলাম? সাম্য আর সম-অধিকারের নামে কমিউনিজম মানুষকে পরিণত করেছে প্রাণহীন ‘সচলযন্ত্রে’। কর্মের বিনিময়ে অন্ন দিয়ে কেড়ে নিয়েছে স্বকীয় সত্তা ও বাকস্বাধীনতা। তাদের অন্তর থেকে মুছে দিয়েছে বিশ্ব প্রভুর অস্তিত্ব। অথচ কিছু অতিবুদ্ধিসম্পন্ন কুচক্রী কমরেড বাস করে চরম বিলাসিতায়। যে শোষণ ও বঞ্চনার জন্য কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর বুকের তাজা খুন ঝরিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করল তারা যে গোলাম সে গোলামই রয়ে গেল। ফল হলো উল্টো। আগে তারা এর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারত, আন্দোলন গড়ত- এখন প্রতিবাদে জেল-জুলুম মৃত্যু। ঝলমলে ঠুনকো এ কাচের দেয়াল অচিরেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। ধ্বংসের অতল গহ্বর থেকে কমিউনিস্টরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
ঠিক এর উল্টো ঘোড়ায় সোয়ার পুঁজিবাদ। তথাকথিত পুঁজিবাদীরা গণতন্ত্র আর বাকস্বাধীনতার নামে কোটি কোটি মানুষকে শোষণ করছে। লাগামহীন অর্থের প্রাচুর্যে বিভোর ধনিক শ্রেণী গড়ে তোলে নিজেদের সুখ সমৃদ্ধির পাহাড়। ফলে লাখো যুবক নিপতিত হয় নিদারুণ বেকারত্বে। কেউ হয় ভূমিহীন। অন্যরা নোঙরা আবর্জনায় লালিত বস্তিবাসী, ফুটপাথের অবহেলিত ভাসমান-ঠিকানাবিহীন মানুষ। ন্যায়-নৈতিকতা বিদূরিত হয় পুঁজিবাদী সমাজে। তরুণ-তরুণী আর যুবারা যায় উচ্ছন্নে। ক্ষণে ক্ষণে দেখা দেয় জন অসন্তোষ।
এ উভয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ আল ইসলাম। যে দেশে, যে জনপদে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল প্রদর্শিত পন্থায় খোদাভীরু লোকদের দ্বারা সমাজ কাঠামো পরিচালিত হয়েছে সেখানেই এসেছে পরম সুখ ও শান্তি। সকল ধর্মের সকল বর্ণের সব সংস্কৃতির মানুষ লীন হয়েছে আল ইসলামে।
আমরা ভারতবাসী মুসলমানরা ভুলে গেছি ইসলামের সেই শাশ্বত বিধান। ডুবে গেছি সুখ সম্ভোগে। কেউ নিপতিত হয়েছি চরম দারিদ্র্যে, আবার কেউ সেজেছি ধনিক-শোষক। প্রায় সাত শত বছর ভারত-শাসক মুসলমান রাজা-বাদশাহরা কাটিয়েছিল ভোগ-বিলাসে। তারা মানেনি কুরআন ও সুন্নাহ। কায়েম করেনি ইসলাম। আল্লাহ তাই তার গজবস্বরূপ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন ইংরেজের গোলামি। তাদের দোসর হিন্দুর চোখ রাঙানি। আমরা হারিয়েছি সুখ-শান্তি-স্বাধীনতা।
এর পরও সময় আছে। আমরা যদি আবার আল্লাহর দ্বীনকে শক্ত হাতে ধরতে পারি, বুঝতে পারি কুরআন-হাদিসকে, ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে পারি আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, খালেদ সাইফুল্লাহ রা:- এর কাফেলা, তবে সে দিন বেশি দূরে নয়, আমাদের এ দেশেও কায়েম হবে মদিনার ইসলাম। হেরার উজ্জ্বল রশ্মিতে প্রদীপ্ত হবে আমাদের প্রতি ঘর।
বলো ফররুখ! তুমি কি তোমার কলমে সে শাশ্বত সত্যের কবিতা গান লিখতে পারবে না? জাগিয়ে তুলবে না ঘুমন্ত এ জাতিকে?
-জ্বি স্যার! আপনি দোয়া করলে কেন পারব না শাশ্বত সত্য ও সুন্দরের অমরবাণী শোনাতে? ইনশাআল্লাহ পারব।
-তবে নাও আমার এ সোনালি কলম। এ কলমে ঝড় তোলো মরু সাইমুমের। নতুন প্রজন্ম মুক্তির দিশা পাবে তোমার কবিতা গানে।
নিজের সমস্ত ভুল স্বীকার করেন ফররুখ। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে মেনে নেন প্রফেসর আবদুল খালেক সাহেবের সব যুক্তি। তার লক্ষ্যভ্রষ্ট মনে ফিরে আসে প্রশান্তি। তিনি মানুষের সার্বিক মুক্তির একমাত্র বিধানরূপে মেনে নেন ইসলাম প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকিমকে।
এবার তার কলম পায় নতুন গতি। কবিতায় আসে নতুন ছন্দ। গানে বাজে নতুন সুর। কবি ফররুখ অলস, অবচেতন, ভীরু ও ঘুমন্ত জাতিকে আহ্বান জানান ‘হেরার রাজ তোরণের’ পথে নতুন সফরের:
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হ’ল জানি না তা।
নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
সাত-সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ,
অচল ছবি সে, তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।
হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো,
হে নাবিক! তুমি মিনতি আমার রাখো :
তুমি উঠে এসো, তুমি উঠে এসো মাঝিমাল্লার দলে,
দেখবে তোমার কিশতি আবার ভেসেছে সাগর জলে।
... ... ...
এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজ-তোরণ,
এখানে এখন প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠছে কেঁপে
এখানে এখন অজস্র ধারা উঠছে দু’চোখ ছেপে
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজ-তোরণ...
(সাত-সাগরের মাঝি)
হেরার আলোকে উদ্ভাসিত কবি শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তিজীবনেও একজন খাঁটি মুসলমানের পথ অনুসরণ করেন। বদলে যায় তার বেশভূষা।
পরনে ধুতির বদলে সাদা পায়জামা। গায়ে সাদামাটা পাঞ্জাবি। কখনো আচকান, শেরওয়ানি। পায়ে কমদামি সেন্ডেল-জুতো। চলার পথে নত দৃষ্টি। কথা-বার্তায় শালীনতা। বন্ধু সংসর্গও পবিত্র।



