নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা নাকি কৌশলগত পুনর্গঠন

জিয়াংয়ের গেম থিওরিতে ‘ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড অর্ডার’

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

প্রথম পর্বে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ তত্ত্বের বিষয়টি আলোচিত হয়, যা একই সাথে বিতর্কিত ও তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিতীয় পর্বে এ তত্ত্বের গভীরতর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণব্যবস্থা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে। এ প্রেক্ষাপটে চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় অধ্যাপক জিয়াং গেম থিওরির আলোকে তথাকথিত ‘ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

মার্কিন ঋণ ও বৈশ্বিক নির্ভরতা : কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ : বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার। সাধারণ অর্থনীতির ভাষায় এটি বিশাল এক বোঝা। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই ঋণ টিকে আছে কারণ বিশ্ব এখনো মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনছে।

যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি মার্কিন ট্রেজারি ধারণ করে, তাদের তালিকায় রয়েছে জাপান, চীন, যুক্তরাজ্য, ভারত, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ানসহ ইউরোপের কয়েকটি আর্থিক কেন্দ্র। অর্থাৎ, এই ঋণের বড় অংশই বহির্বিশ্ব দ্বারা অর্থায়িত। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে- কেন এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে এত বিপুল পরিমাণে ঋণ দিচ্ছে? উত্তরটি সরল- কারণ তারা এখনো ডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল : যদি এশিয়া ও ইউরোপ ধীরে ধীরে ডলার থেকে সরে গিয়ে বিকল্প মুদ্রা- যেমন স্বর্ণ বা অন্যান্য স্থিতিশীল মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে মার্কিন অর্থনীতি বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে পারে।

যুদ্ধ কিভাবে এই ঝুঁকি কমায় : ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এশিয়া ও ইউরোপ- যারা আগে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল তারা এখন বাধ্য হচ্ছে বিকল্প উৎস খুঁজতে। এই বিকল্প মূলত দু’টি- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। ফলে একটি নতুন নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি, সার, খাদ্য ও কাঁচামালের জন্য ইউরোপ ও এশিয়াকে এখন উত্তর আমেরিকার দিকে তাকাতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আর্থিক ব্যবস্থায়।

কারণ, যদি আপনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হন, তাহলে আপনি ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে যেতে পারবেন না। অর্থাৎ, মার্কিন ঋণব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখার একটি ‘অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা’ তৈরি হচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যুদ্ধ শুধু সামরিক সঙ্ঘাত নয়- এটি বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

রাশিয়ার উদাহরণ : দীর্ঘ যুদ্ধের কৌশল

এই বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা আসে- রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া ইউক্রেনে দ্রুত বিজয়ের পথ নেয়নি। বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী, ধীরগতির ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ বেছে নিয়েছে। প্রথম নজরে এটি দুর্বলতা মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি কৌশল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়া তার অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করছে- বেসামরিক শিল্প থেকে সামরিক শিল্পে রূপান্তর; ড্রোন ও অস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভরতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য শিল্পভিত্তিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। ফলে রাশিয়া ধীরে ধীরে একটি ‘যুদ্ধনির্ভর অর্থনীতি’-তে পরিণত হচ্ছে। এই মডেলের মূল ধারণা হলো- যুদ্ধ শুধু ধ্বংস করে না, এটি রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং শিল্পায়নের গতি বাড়ায়।

ভূরাজনৈতিক দর্শন : ‘তৃতীয় রোম’ ধারণা

রাশিয়ার এই কৌশলের পেছনে একটি গভীর ভূরাজনৈতিক দর্শন রয়েছে, যা আলেকজান্ডার ডুগিনের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান একমেরু বিশ্বব্যবস্থা- যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রধান শক্তি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে।

কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন- অতিরিক্ত ব্যক্তিবাদ; ধর্মনিরপেক্ষতা ও ভোগবাদকেন্দ্রিক সমাজভিত্তিক এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তার পরিবর্তে তিনি একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে রাশিয়া একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ‘সভ্যতা-রাষ্ট্র’ হিসেবে আবির্ভূত হবে- যাকে তিনি ‘তৃতীয় রোম’ ধারণার সাথে যুক্ত করেন। এই কৌশলের মূল উপাদান : জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক ঐক্য; দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও মিত্রভিত্তিক আঞ্চলিক ব্লক।

‘টেকনেট’ বনাম ‘তৃতীয় রোম’: দুই মডেলের সংঘর্ষ

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কৌশলকে অনেকে ‘টেকনেট’ ধারণার সাথে তুলনা করেন। এটি মূলত একটি প্রতিক্রিয়াশীল মডেল- যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও একটি বৃহৎ আঞ্চলিক জোট গঠন করতে চায়, যা সম্পদ ও উৎপাদনে স্বনির্ভর হবে।

এই ধারণার সাথে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক আচরণের মিল পাওয়া যায়: গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ; কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে চাপ সৃষ্টি এবং লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। এই সবকিছু মিলিয়ে ‘বৃহত্তর উত্তর আমেরিকা’ ধারণা সামনে আসে। অর্থাৎ, যদি রাশিয়া ‘তৃতীয় রোম’ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘টেকনেট’ বা মহাদেশভিত্তিক অর্থনৈতিক দুর্গ তৈরি করতে পারে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা বনাম ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ ধারণা সামনে আনেন। এই ব্যবস্থার তিনটি মূল ভিত্তি ছিল : ১. যুক্তরাষ্ট্র হবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র; ২. ভোগবাদ ও বহুসংস্কৃতিবাদ বিশ্বকে একত্র করবে এবং ৩. যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তার গ্যারান্টর হবে।

ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু এই কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে আর সবার নিরাপত্তার দায় নিতে হবে না; উৎপাদন ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে এবং বৈশ্বিক নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে।

সমালোচনা ও বাস্তবতা

তবে এই তত্ত্বের মধ্যে কিছু স্পষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার জায়গা রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বংস করতে চাইবে- এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা এত বেশি যে ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তৃতীয়ত, ইউরোপ ও এশিয়ার মতো অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এত সহজে নির্ভরশীল অবস্থায় ফিরে যাবে- এটিও নিশ্চিত নয়।

কৌশল, নাকি অতিরঞ্জন?

এই বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে- ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি কি এলোমেলো, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর কৌশল? গেম থিওরির আলোকে দেখা যায়, কখনো কখনো ‘অযৌক্তিক’ আচরণই প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, এই তত্ত্ব যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, এটি এখনো একটি অনুমানভিত্তিক বিশ্লেষণ। তবুও একটি বিষয় পরিষ্কার- ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এবং এর বিস্তৃত প্রভাব বিশ্বকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।