ব্যাংক খাত সংস্কারে কঠোর অবস্থান লুটেরা গোষ্ঠীর ফেরার পথ বন্ধের বার্তা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক নিয়ে একীভূত করার প্রক্রিয়া অর্থাৎ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম আগের মতোই থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাথে ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) বৈঠকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, নতুন ব্যাংক রেগুলেশন আইনের আওতায় অতীতে অনিয়ম ও লুটপাটের সাথে জড়িত কোনো গোষ্ঠীকে আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে দেয়া হবে না। একই সাথে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবন এবং বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বিএবি চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার সাংবাদিকদের বলেন, সরকার যে নতুন ব্যাংক রেগুলেশন আইন করেছে, তার সব শর্ত পূরণ করলেও অতীতে অনিয়মের সাথে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ব্যাংকের মালিকানা কিংবা নিয়ন্ত্রণে ফিরতে দেয়া হবে না বলে গভর্নর পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে।

বৈঠকে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ প্রসঙ্গও গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। গভর্নর জানান, পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা আগের পরিকল্পনা অনুযায়ীই বাস্তবায়ন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বৈঠকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮-ক ধারা নিয়েও আলোচনা হয়। এই ধারা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলের কিছু উদ্বেগ রয়েছে বলে জানায় বিএবি। তবে গভর্নর এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে জানান আবদুল হাই সরকার। তিনি বলেন, বর্তমানে এমন কোনো সুযোগ নেই যার মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। আলোচিত ধারাটিও এখন কার্যকর অবস্থায় নেই বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংক খাতের পাশাপাশি শিল্প খাতের সঙ্কটও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা সঙ্কটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সচল করতে একটি বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজের প্রস্তাব নিয়ে মতবিনিময় হয় বলে জানান বিএবি চেয়ারম্যান। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই সহায়তা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাস্তবে উৎপাদন ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু চলতি মূলধনের অভাবে সঙ্কটে পড়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণের দায়, উৎপাদন পরিস্থিতি এবং ব্যবসার বাস্তবতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অর্থাৎ নির্বিচারে অর্থ সহায়তা না দিয়ে কার্যকর ও সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখাই হবে মূল লক্ষ্য। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন খাতে স্থবিরতা কিছুটা কাটতে পারে এবং কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

ব্যাংকাররা অবশ্য বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আরো বিস্তৃত আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আরো কার্যকর হবে এবং বাজারে আস্থাও বাড়বে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক অস্থিরতা, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং আমানতকারীদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারণে অংশীজনদের সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

শিল্প খাতের অন্যতম বড় সঙ্কট হিসেবে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সঙ্কটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং রফতানি সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। একই সাথে দুর্বল ব্যাংক সংস্কার ও শিল্প খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগে বাস্তব ফল দিতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বৈঠকে ব্যাংকিং ও শিল্প খাতের চলমান সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশ্বাস দিয়েছে, প্রয়োজনীয় নীতিগতসহায়তা অব্যাহত থাকবে। তবে যে কোনো আর্থিক সুবিধা বা পুনঃঅর্থায়ন কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই দেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থানকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।