দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে স্পষ্টভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যেখানে বিনিয়োগের গতি বাড়ার কথা, সেখানে নানা কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা প্রত্যাশিত ৩০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ডলার সঙ্কট, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্থিরতা- এই চারটি বড় কারণ বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের কাছাকাছি ওঠানামা করায় নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে পারছেন না। একইসাথে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ মানে অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করা। ডলার সঙ্কটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমরা নতুন প্রকল্পে না গিয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে কয়েক বছর আগে এটি ছিল ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এই প্রবণতা শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
এমন পরিস্থিতিতে তাসকীন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কর নীতির ঘনঘন পরিবর্তন, যা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, নীতিগত স্থিতিশীলতা না থাকলে কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আমরা চাই অন্তত পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল শিল্প ও করনীতি থাকুক, যাতে উদ্যোক্তারা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারেন।
তবে এই স্থবিরতার মধ্যেও সম্ভাবনার দিক দেখছেন অনেকেই। তাদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল খাতে দ্রুত অগ্রগতি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। ইতোমধ্যে দেশে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি উৎপাদনকার্যক্রম শুরু করেছে।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই বা ফিকি) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল হলে বিদেশী বিনিয়োগও বাড়বে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, আইটি এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাতে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ গতি আনতে ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে হবে। একই সাথে ডলার বাজারে স্বচ্ছতা আনা, দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কর কাঠামো স্থিতিশীল রাখা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সংলাপ জোরদার করে নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আস্থার সঙ্কট দূর করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ এবং লাভজনক হবে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকলেও সঠিক নীতি ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া গেলে এই খাত আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে এমনটাই মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।



