রফিকুল হায়দার ফরহাদ উড়ির চর (নোয়াখালী) থেকে ফিরে
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল মানেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর প্রাণহানির দীর্ঘ ইতিহাস। কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন থেকে শুরু করে খুলনা-সাতক্ষীরার সুন্দরবন- কোনো অঞ্চলই প্রকৃতির এই ভয়াবহ রূপ থেকে রেহাই পায়নি। ১৯৭০, ১৯৯১ এবং ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আজও মানুষের স্মৃতিতে রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে।
এই দীর্ঘ দুর্যোগ-ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি সন্দ্বীপ চ্যানেলে অবস্থিত উড়ির চর- এটি এমনই একটি জনপদ, যেখানে ঝড় শুধু অতীতের ঘটনা নয়; বরং প্রতিনিয়ত বয়ে বেড়ানো এক স্থায়ী আতঙ্ক।
ঝড়ের স্মৃতি ও রাষ্ট্রপ্রধানদের পদচারণা
১৯৮৫ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় উড়ির চরকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে, বহু পরিবার চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেই দুর্যোগের পর এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে এক বিরল ঘটনা- তিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আগমন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে উড়ির চরে যান। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাও এই চর পরিদর্শন করেন; কিন্তু এত উচ্চপর্যায়ের সফর ও আশ্বাস সত্ত্বেও উন্নয়নের বাস্তব চিত্র আশানুরূপ হয়নি- এটাই উড়ির চরের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
বারবার আঘাত, একই দুর্বলতা
১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭ সালের সিডরের সময়ও উড়ির চর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কিন্তু এতবার দুর্যোগের অভিজ্ঞতা থাকার পরও এখানে গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা। প্রায় ২০ হাজার মানুষের এই চরে সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে মাত্র তিনটি, যেখানে সর্বোচ্চ হাজারখানেক মানুষ আশ্রয় নিতে পারে।
উড়ির চর সমিতি বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাউসার বলেন, মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে মাত্র তিন বছর বয়সেও ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় বেঁচে গেছি। বড় ভাই, বোন, ফুফা, ফুফু, জেঠাতো ভাই, জেঠাতো বোনসহ ১২/১৪ জন আত্মীয় মারা যায়। ঝড়ের সময় আসা জলোৎচ্ছ্বাসে আমাদের দু’টি ঘর ভেসে যায়। তখন উড়ির চরে কোনো বিল্ডিং বা পাকা ঘর ছিল না। ছিল না কোনো সাইক্লোন শেল্টরাও। ফলে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। অনেকেই ভেসে যাওয়ায় তাদের লাশও পাওয়া যায়নি। আমার এক ভাই ছিল বাবার কাছে। আরেক বোন ছিল মায়ের কাছে। বাবা-মা বেঁচে গেলেও দুই ভাই-বোন ভেসে গেছে। তবে আমাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন।
১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঝড়ও ছোবল মেরেছিল উড়ির চরে। তবে ১৯৮৫ সালের ঝড়ের পর এরশাদ সরকারের আমলে বেশ কিছু পাকা ঘর নির্মিত হয় উড়ির চরে। কায়সার জানান, ১৯৯১ সালের ঝড়ে যারা ওই ঘরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল তারা প্রাণে বেঁচে গেছেন; কিন্তু যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাননি বা ওই পাকা ঘরে জায়গা পাননি তাদের অনেকেই মারা গেছেন।
উড়ির চরের চট্টগ্রাম তথা সন্দ্বীপ অংশের জীবনতলা মোস্তাফিজুর রহমান দাখিল মাদরাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট হাফেজ মাইনুদ্দিন। তার মতে, ১৯৯১ সালের ঝড় এবং পরে সিডরের সময় প্রচুর গবাদিপশু ভেসে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, সমিতি বাজার হলো নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চর এলাহী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড। আর কলোনীবাজারের পাশে থাকা জীবনতলা মোস্তাফিজুর রহমান দাখিল মাদরাসা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের অংশে পড়েছে। সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে ভাগ করা দুই জেলার অংশ। এই সীমানা নিয়ে বিরোধ আছে জানিয়ে ব্যবসায়ী কায়সার বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল দুই ঘাটেই যাওয়া। উল্লেখ্য, উড়ির চর পূর্ব-পশ্চিমে ২৮ কিলোমিটার। আর উত্তর -দক্ষিণে ১৯/২০ কিলোমিটার আয়তনের।
নদীভাঙন : অস্তিত্ব সঙ্কটের আরেক নাম
ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি উড়ির চরের আরেক বড় সঙ্কট নদীভাঙন। যে অংশের নামে এই চরের নামকরণ- সেই মূল উড়ির চরই আজ প্রায় বিলীন। পূর্ব ও পশ্চিম অংশে অব্যাহত ভাঙনে গত কয়েক দশকে প্রায় ১০/১১ কিলোমিটার এলাকা নদীতে হারিয়ে গেছে। এই তথ্য দিলেন জীবনতলা মাদরাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট হাফেজ মাইনুদ্দিন। এই ভাঙন শুধু জমি নয়, মানুষের স্মৃতি, বসতি এবং জীবনের নিরাপত্তাকেও গ্রাস করছে। এই নদীভাঙনের ফলে ভাটার সময় ট্রলার বা স্পিড বোটে উঠতে বেশ কষ্ট হয় যাত্রীদের। কোথায়ও গোড়ালি, কোথাও হাঁটু পর্যন্ত দেবে যায় কাদায়। তখন ট্রলারে পণ্য তোলা কুলিদের মারাত্মক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। নিজ চোখেই দেখলাম ভাটার সময় প্রায় ২০ ফুট নদীর খাড়িতে থাকা ফুটখানেক কাদা ডিঙ্গিয়ে নিচে নেমে এরপর যাত্রীদের স্পিড বোটে উঠতে।
উন্নয়ন বনাম বাস্তবতা
রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর এবং বিভিন্ন সময়ের সরকারি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও উড়ির চরের বাস্তবতা কঠিন ও বেদনাদায়ক। এখানে কোনো পাকা সড়ক নেই; পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নেই; নেই কোনো আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সীমিত। বছর দশেক আগে চারের খাইল্লা ঘাট থেকে কলোনি বাজার ঘাট পর্যন্ত ইটের রাস্তা হয়েছে। আর বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে বছর দু’য়েক আগে। এই তথ্য দেন মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ হৃদয়। ব্যবসায়ী কায়সারের দেয়া তথ্য, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলোর অবস্থান বেশ দূরে। ফলে কোনো কোনো ছাত্রছাত্রীকে ছার/পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। আমার ছেলেও এভাবে স্কুলে যায়। অর্থাৎ, একটি দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে টিকে থাকার জন্য যে ন্যূনতম অবকাঠামো প্রয়োজন- তার অনেকটাই এখানে অনুপস্থিত।
আতঙ্কের সাথে সহাবস্থান
আজও ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই উড়ির চরের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটায়। কারণ তারা জানে- দুর্যোগ এলে বাঁচার সুযোগ সীমিত। হাফেজ মাইনুদ্দিন জানান, ‘উড়ির চরের দক্ষিণ অংশে পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ একটি মাত্র সাইক্লোন শেল্টার আছে। এতে মানুষের ধারণক্ষমতা দুই/তিন শত। ফলে আমরা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে প্রচণ্ড আতঙ্কে থাকি।’
উড়ির চর তাই কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় ঝুঁকি, অবহেলা এবং অসম উন্নয়নের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ এখনো অপেক্ষা করছে নিরাপদ ভবিষ্যতের।



