‘দু’মুঠো খাইয়া সুখে বাঁচতে চাই আমাগোর বাজেট লাগব না’

খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে বাজেট

Printed Edition

আব্দুল কাইয়ুম

আমি গরিব মানুষ। দিনে যা কামাই করি তা দিয়া কোনো রহম বউ বাচ্চা লইয়া দিন চইলা যায়। বাজেট-মাজেট কিছুু বুঝি না বাবা। কিন্তু এইডাই জানি সবাইরে লইয়া দু’মুঠো খাইয়া শান্তিতে বাকিডা জীবন কাডাইয়া দিতে চাই। এসব কথাই বলছিলেন প্রায় ৭০ বছর বয়সী রিকশাচালক বজলু মিয়া। গতকাল দুপুরে ঝুম বৃষ্টির সময় রাজধানীর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে একটি দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। তাকে দেখতে মনে হয় বয়সের বাড়ে অনেকটা নুয়ে পড়েছেন। তবে চোখে-মুখে এখনো কমেনি কর্মচঞ্চলতা।

তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বাজেট মানে কী আমি জানি না, তবে আমাদের কথাও যেন সরকার চিন্তা করে। কারণ বাজারে গেলে কিছুই কিনতে পারি না। কোনো সবজি ৬০ থেকে ৭০ টাকার নিচে নাই। তা ছাড়া মাছ ও মুরগির দামও আকাশছোঁয়া। সর্বশেষ কবে গরুর গোশত কিনে খেয়েছি ভুলেই গেছি। আমরা সাধারণ মানুষ কিছুই চাই না, পরিবার নিয়ে যেন খেয়ে বাঁচতে পারি সেটাই চাই। জিনিসপত্রের দাম না কমলে বাজেট দিয়ে কী হবে। আর আমরাই বা কিভাবে চলব।

তিনি আরো বলেন, বাজেট কী তা আমরা না বুঝলেও চালের কেজি কত, তেলের কেজি কত ঠিকই বুঝি। সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা পাই, বাজারে গেলে তার অর্ধেক এক কেজি চাল আর কিছু শাক-সবজি ও ডালেই শেষ হয়া যায়। আমাদের জন্য বাজেটে সব কিছুর দাম কমানোর ব্যবস্থা করা দরকার।

আরেক রিকশাচালক কবির হোসেন বলেন, এই বয়সেও রিকশা টানি কারণ ঘরে সাবালক ছেলে নাই। শরীরটা ভালো যায় না। বাজেটে আমাদের মতো বুড়া রিকশাচালকদের জন্য যদি কম দামে রেশন আর ফ্রিতে চিকিৎসার কার্ড দিত, তাইলে শান্তি পাইতাম। বাজেট ঘোষণার পরদিনই গ্যারেজ মালিক রিকশার জমা বাড়ায় দেয়, মেস মালিক সিট ভাড়া বাড়ায় দেয়। সংসার চালাইতে পারি না। বাড়িতে টাকা পাঠাইতে কষ্ট হয়। এছাড়া শাহবাগ এলাকায় ভেনগাড়িতে ফল বিক্রি করছিলেন আজিজুল। বাজেট নিয়ে তার প্রত্যাশা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজেট আসলেই শুনি কোটি কোটি টাকার হিসাব। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পরদিনই বাজারে সব কিছু দাম বেড়ে যায়। বাসার মালিক বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। আমাদের আয় তো বাড়ে না, উল্টা খরচ বেড়ে যায়। আমরা চাই সরকার যেন নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখে।

অন্য দিকে ফুটপাথ ব্যবসায়ী ইমরান বলেন, বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিবার নিয়া ঢাকা শহরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজেটে বড় বড় রাস্তার কথা না ভেবে, আমাদের মতো গরিব মানুষ যেন শান্তিতে কাজ করে খেতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা উচিত। বাজেটের পর যদি গ্যাসের দাম আর বিদ্যুতের দামসহ সব কিছুর দাম বাড়ে তাহলে আমরা পরিবার নিয়ে থাকব কিভাবে।

জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে প্রতি বছরই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মনে দানা বাঁধে নানা আশা আর উৎকণ্ঠা। দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক ও নি¤œ আয়ের মানুষের কাছে বাজেট মানেই কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি তাদের আগামী এক বছরের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সমীকরণ। এসব মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি বড় নয়। তারা কোনো বিলাসীজীবনের স্বপ্ন দেখেন না। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই সার্থক হবে, যখন একটি বাজেট দেশের প্রান্তিক মানুষের থালায় তিন বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা দিতে পারবে।

মেহনতি মানুষ জানায়, মেহনতি মানুষের প্রধান দাবি চাল, ডাল, তেল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের দাম কমলে সুন্দরভাবে চলতে পারবে। কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। স্বল্পমূল্যের খাদ্যসহায়তা কার্ডের সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার। গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং গ্যাস-বিদ্যুতের দাম সাধারণের সাধ্যে রাখা। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ ও সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ এবং বিনামূল্যে বই-খাতা বিতরণ বাড়ানো দরকার। মূল্যস্ফীতির সাথে মিলিয়ে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি সাধারণ শ্রমিকদের।