অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতা
শিক্ষা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলেও কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামে মানসম্পন্ন শিক্ষার আলো ছড়াতে পারছে না। নান্দনিক ভূ-প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই জনপদে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বড় ধরনের ঘাটতি।
অষ্টগ্রামে বর্তমানে ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩টি মাধ্যমিক, তিনটি উচ্চমাধ্যমিক ও একটি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত, এমনকি অতিরিক্ত একাডেমিক ভবনও নির্মিত হয়েছে। তবে অবারিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও পাবলিক পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত ফলাফল মিলছে না। পুরো উপজেলায় জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র ৮ থেকে ১০, যা শহরাঞ্চলের একটি সাধারণ বিদ্যালয়ের তুলনায় খুবই হতাশাজনক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাওরের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদাসীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মে জর্জরিত।
হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ অভিভাবকই কৃষিজীবী। সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে তাদের তদারকি নেই বললেই চলে। উল্টো বোরো রোপণ ও ফসল কাটার মৌসুমে ছেলেমেয়েদের মাঠে কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে দীর্ঘ সময় পাঠবিরতি ঘটায় ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ছে বহু শিশু। অন্য দিকে মাধ্যমিক স্তরে কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকরা দায়সারাভাবে রুটিনমাফিক লেকচারভিত্তিক ক্লাস নিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ফাঁকিবাজি আর জবাবদিহির অভাবের কারণে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে আদর্শ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সক্ষমতা ও নৈতিকতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এর বাইরে শিক্ষক সঙ্কট মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম প্রধান অন্তরায়। শহর থেকে দুর্গম হাওর এলাকায় এসে শিক্ষাদানে অনেক শিক্ষকের অনীহা রয়েছে। আবার সন্তোষজনক বেতন কাঠামো ও আবাসন সুবিধা না থাকায় অনেক শিক্ষককে ৫০-৬০ কিলোমিটার দূর থেকে যাতায়াত করতে হয়, যা তাদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে শ্রেণিকক্ষে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, হাওরের শিক্ষার্থীরা মেধায় পিছিয়ে নেই। তারা মূলত উপযুক্ত পরিবেশ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ছিটকে পড়ছে। আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক গড়ে তুলতে হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নত করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। একই সাথে গতানুগতিক পাঠদানের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও সক্রিয় শিখনপদ্ধতির কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করে হাওরের মানবসম্পদকে কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: শাহজাহান নয়া দিগন্তকে বলেন, হাওরে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শহর থেকে মেধাবী শিক্ষকরা সেখানে যেতে চায় না, হাওরের ধনীক শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা শহরের নামী-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে, তা ছাড়া অভিভাবকদের অসচেতনতা, দারিদ্রতা হাওরে মানসম্পন্ন শিক্ষা পিছিয়ে পড়া অন্যতম কারণ।
হাওর অঞ্চলবাসীর (পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠন) সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান বাবু বলেন, হাওর অঞ্চলের শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার কারণ শুধু দারিদ্র নয়, এটি ভৌগোলিক, জলবায়ু, অবকাঠামোগত , প্রশাসনিক, সামাজিক সমস্যা। তা ছাড়া বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক সংকট, অভিভাবকদের নিরক্ষরতা, কার্যকর ক্লাসের সংখ্যা কম হওয়া, অনুপস্থিতি অন্যতম কারণ।



